বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর ঘিরে যে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল, তা এখন নতুন মোড় নিয়েছে। দ্বিপাক্ষিক সফরের আগ্রহ ও ভারতের প্রস্তাব সত্ত্বেও সফরটি আপাতত স্থগিতের ঘোষণা অনেকটা কূটনৈতিক মহলে চমক তৈরি করেছে। মূলত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত কিছু কঠোর শর্ত এই স্থগিতের নেপথ্যের মূল কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা এটিকে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন এবং স্পর্শকাতর অধ্যায় হিসেবে দেখছেন।
সম্প্রতি ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এক ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ভারত সফরের জন্য একটি ‘সহায়ক পরিবেশ’ প্রয়োজন। সেখানে স্পষ্টভাবে কয়েকটি শর্তের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান শর্ত হলো দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য পলাতক অপরাধীদের দ্রুত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো এবং শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের হস্তান্তর নিশ্চিত করা। স্বাভাবিকভাবেই, এই শর্তগুলো ভারতের কাছে কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিল। দেশটি এখনো এই বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দেয়নি, যা প্রমাণ করে যে ভারত তার আগের অবস্থান থেকেই কাজ করছে।
তবে প্রশ্ন উঠছে, ঢাকা কেন এমন কঠোর অবস্থান নিল? এর পেছনে মূলত তিনটি বড় কারণ কাজ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। প্রথমত, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক প্রেস ব্রিফিং। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে আশ্রয় নিয়ে তার এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ঢাকা মোটেও ভালোভাবে নেয়নি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের পুনরায় সক্রিয় হওয়ার প্রচেষ্টা, যা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তৃতীয়ত, শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারতের ভূমিকা এবং তার পেছনে দেশটির পরোক্ষ সমর্থন আছে কি না, তা নিয়ে ঢাকার মধ্যে তৈরি হওয়া গভীর অবিশ্বাস।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্য থেকে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়েছে, যেখানে তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে ভারত একই সঙ্গে ‘হাসিনা কার্ড’ খেলবে এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের আশা করবে তা সম্ভব নয়। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বলছে, তারা নতুন করে সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস করতে চায়, যেখানে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি প্রাধান্য পাবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বোঝাতে চাচ্ছে যে, পুরোনো সম্পর্কের কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে জাতীয় মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে একটি নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করতে চায় বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই শর্তগুলো কূটনৈতিক পর্যায়ে বেশ জটিলতা তৈরি করেছে। অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস থাকলেও আলোচনার পথ বন্ধ করা কোনো পক্ষের জন্যই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা কিংবা জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সমাধানের জন্য শীর্ষ পর্যায়ের সংলাপ অপরিহার্য। অন্যদিকে, অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্ত মনে করেন, এই ধরনের শর্ত দিয়ে সম্পর্কের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা কঠিন, বরং সামনাসামনি আলোচনার মাধ্যমেই অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙা সম্ভব।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের জন্যই সম্পর্কটি একটি নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকা তার সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীন থেকে সম্পর্কের সমীকরণ বদলাতে চাইছে, আর দিল্লি হয়তো পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে নতুন কোনো কূটনৈতিক কৌশলের খোঁজে আছে। তবে দিনশেষে এটাই সত্য যে, পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই এই অচলাবস্থা কাটিয়ে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে। সরাসরি সংলাপের বিকল্প কিছু নেই, এবং সেই সংলাপেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্কের পরবর্তী রূপরেখা।
মন্তব্য করুন