বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির অঙ্গনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির একটি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত নাম। ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি ধারাবাহিকভাবে নিজেদের আদর্শিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। মীর কাসেম আলীর হাত ধরে যাত্রা শুরু করা এই সংগঠনটি মূলত জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত। যদিও ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য বিতর্কিত পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সাথে তাদের সংযোগের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক রয়েছে, তবে ছাত্রশিবির কর্তৃপক্ষ বরাবরই এই ধারাবাহিকতা অস্বীকার করে এসেছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে আশির দশকে দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে ছাত্রশিবির নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে শুরু করে। তবে বিভিন্ন সময়ে প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের সাথে সহিংস সংঘর্ষ, হত্যাকাণ্ড এবং ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতি পরিচালনার জন্য সংগঠনটি সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশক এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় ছাত্রশিবিরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনেও এই সংগঠনটিকে সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে, যা ছাত্রশিবির নেতৃবৃন্দ সবসময়ই ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছেন।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন ছাত্রশিবির এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে পার করেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের এই সময়কালে সংগঠনটির কার্যক্রম কার্যত নিষিদ্ধ ছিল এবং তাদের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমন-পীড়ন ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। অনেকে আত্মগোপনে থেকে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করে। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার সংগঠনটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
এই পট পরিবর্তনের পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের অভাবনীয় বিজয় তাদের নতুন করে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চার অনুপস্থিতি এবং প্রচলিত ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রতি শিক্ষার্থীদের একটি অংশের অনীহা শিবিরের এই নির্বাচনী সাফল্যে বড় ভূমিকা রেখেছে। একই সাথে সংগঠনটির সুশৃঙ্খল গোপন সাংগঠনিক কাঠামো ও স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পৃক্ততা তাদের এই সাফল্যের অন্যতম নিয়ামক। তবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ম্যাগাজিনে প্রকাশিত বিতর্কিত প্রবন্ধ বা গুমের শিকার নেতাকর্মীদের নিয়ে করা সাম্প্রতিক আইনি লড়াইয়ের বিষয়গুলো সংগঠনটিকে নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের রাজনীতির এক জটিল সন্ধিক্ষণে ছাত্রশিবির এখন তার পুরনো ইমেজ বদলে নতুন করে পরিচিতি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
মন্তব্য করুন