চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে আলোচনা চলছে ফলাফল বিপর্যয় নিয়ে। গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার প্রায় ছয় শতাংশের বেশি কমেছে এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে প্রায় বাইশ হাজারের বেশি। শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ফলাফল বিপর্যয়ের পেছনে কোনো একটি মাত্র কারণ দায়ী নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদী শিখন ঘাটতি, বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন, গণিত ও ইংরেজিতে মৌলিক দুর্বলতা, মুখস্থ ও গাইডনির্ভর পড়াশোনা, শিক্ষক সংকট এবং গ্রাম-শহরের প্রকট বৈষম্যসহ নানাবিধ নেতিবাচক প্রভাব এর জন্য দায়ী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম জানান, মাধ্যমিকের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীরা মহামারীর ধাক্কায় পড়েছে এবং পরবর্তীতে নবম শ্রেণীতে এক কারিকুলাম এবং দশম শ্রেণীতে গিয়ে আবার ভিন্ন কারিকুলামের মুখোমুখি হয়েছে। এর পাশাপাশি এবার পরীক্ষার হলে কড়া নজরদারি ও সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহারের কারণেও শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা শিখন ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে এই ফলকে ইতিবাচক হিসেবে দেখে এখন শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পরিসংখ্যান বলছে, এবার ইংরেজিতে ১১টি শিক্ষা বোর্ডে ফেল করেছে ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং গণিতে ফেলের হার ২২ শতাংশ। গণিতে নিয়মিত অনুশীলনের অভাব ও মৌলিক ধারণার পাশাপাশি ইংরেজিতে গ্রামার, রিডিং ও ভাষাগত দক্ষতায় বড় ধরনের দুর্বলতা ফুটে উঠেছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান তপন কুমার সরকার মনে করেন, ইংরেজি ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় পর্যায়ে বিশেষ কর্মসূচি এবং দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া শিক্ষার্থীরা কম পড়াশোনা করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। ক্লাসরুমের শিক্ষার চেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে গাইড বই, নোট এবং সাজেশন মুখস্থ করার প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান উল্লেখ করেছেন যে, পাঠ্যবই থেকে সরাসরি বা গতানুগতিক প্রশ্ন করার ফলে শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণ, যুক্তি ও প্রয়োগের দক্ষতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি দেশে এখনো পুরোপুরি মানসম্মত ও অভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতি গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তীব্র শিক্ষক সংকট এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অবসরে যাওয়ার ফলে পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খান বলেন, বিদ্যালয়ের নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করার পরও একজন শিক্ষার্থী যদি বোর্ড পরীক্ষায় ফেল করে, তবে এর দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়, বরং পাঠদান, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষকদের পেশাগত দায়বদ্ধতার বড় ঘাটতি এর জন্য দায়ী। বিশেষ করে গ্রাম ও শহরের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যকার বৈষম্য এবারকার ফলে আরও বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে। ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফল তুলনামূলক ভালো হলেও গ্রামাঞ্চলের অনেক প্রতিষ্ঠানের ফল অত্যন্ত হতাশাজনক। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন যে গ্রামগঞ্জের অনেক স্কুলে বাংলার শিক্ষক দিয়ে ইংরেজি ও গণিত পড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটে থাকে, যার খেসারত দিতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। করোনাকালীন বিপর্যয় ও শিক্ষাঙ্গনের নানা অস্থিরতা কাটিয়ে উঠতে গ্রাম-শহরের বৈষম্য কমানো এবং শিক্ষক সংকট দূর করার পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি, সেগুলোর প্রতি বিশেষ নজর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।