সামান্য জ্বর-কাশি ভেবে যে ফ্লুকে অনেক সময় অবহেলা করা হয়, হৃদ্রোগীর ক্ষেত্রে সেটিই কখনো বড় ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের কারণে হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে, যা হার্ট অ্যাটাকসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই হৃদ্রোগের চিকিৎসা শুধু নিয়মিত ওষুধ সেবন ও জীবনযাপনে পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সংক্রমণ প্রতিরোধের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় টিকা ফ্লু ও নিউমোনিয়ার মতো সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে এবং এসব সংক্রমণ থেকে তৈরি হতে পারে এমন জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজি (ESC) হৃদ্রোগ প্রতিরোধের অংশ হিসেবে টিকাদানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। একইভাবে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) ও আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি (ACC) ক্রনিক করোনারি ডিজিজে প্রতিবছর ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। উপযুক্ত রোগীদের ক্ষেত্রে নিউমোকক্কাল টিকার বিষয়টিও বিবেচনা করার কথা বলা হয়েছে।
বিশেষ করে হার্ট ফেইলিউর, করোনারি আর্টারি ডিজিজ বা আগে হার্ট অ্যাটাক হয়েছে এমন ব্যক্তিদের ফ্লু থেকে জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। বয়স্ক হৃদ্রোগী এবং হৃদ্রোগের পাশাপাশি ডায়াবেটিস বা অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। এসব রোগীর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ফ্লু বা নিউমোনিয়ার মতো সংক্রমণ কখনো এতটাই গুরুতর হয়ে উঠতে পারে যে হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে আগে থেকেই হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সংক্রমণের সময় শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
টিকা এসব সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে সংক্রমণ কম হলে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যেও রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কমানো সম্ভব হতে পারে।
টিকা নেওয়ার পর শরীরে সংশ্লিষ্ট জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি হতে সাহায্য করে। ফলে পরবর্তীতে সংক্রমণের ক্ষেত্রে শরীর দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তবে কোন টিকা কখন নেওয়া প্রয়োজন, তা ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য রোগের ওপর নির্ভর করে।
ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকার মতো নিউমোকক্কাল টিকা প্রতিবছর নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। বয়স, অন্যান্য শারীরিক সমস্যা এবং আগে নিউমোকক্কাল টিকা নেওয়া হয়েছে কি না, এসব বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসক ঠিক করেন কোন টিকা কখন প্রয়োজন।
প্রয়োজন অনুযায়ী ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোকক্কাল টিকা একই সময়ে দেওয়াও সম্ভব হতে পারে। তবে এ বিষয়ে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
হার্ট অ্যাটাক, স্টেন্টিং বা বাইপাস হয়েছে বলে টিকা নেওয়া যাবে না, এমন ধারণা সঠিক নয়। রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল হওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া যেতে পারে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামান্য ও সাময়িক হয়ে থাকে। তবে টিকা নেওয়ার আগে নিজের চিকিৎসার ইতিহাস, চলমান ওষুধ এবং অন্যান্য শারীরিক সমস্যা সম্পর্কে চিকিৎসককে জানানো জরুরি।
হৃদ্রোগ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ওষুধ, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক সক্রিয়তা ও অন্যান্য জীবনযাপনের পরিবর্তনের পাশাপাশি সংক্রমণ প্রতিরোধেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া তাই হৃদ্রোগীর সামগ্রিক প্রতিরোধমূলক যত্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
মন্তব্য করুন