মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে শরীরের প্রতিটি অঙ্গ যে একই গতিতে বুড়িয়ে যায় না, তা এখন আর কেবল তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন ‘অর্গান এইজ ব্লাড টেস্ট’ বা অঙ্গের বয়স নির্ণায়ক রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এখন মানুষের আসল ক্যালেন্ডারের বয়সের বাইরেও শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের প্রকৃত বয়স জানা সম্ভব হচ্ছে। এই পরীক্ষাটি মূলত ‘প্রোটিওমিক্স’ প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। আমাদের শরীরের হৃদপিণ্ড, কিডনি, লিভার বা মস্তিষ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো যখন ধীরে ধীরে ক্ষয় হতে থাকে, তখন তারা রক্তে এক ধরনের প্রোটিনের চিহ্ন বা ‘সিগনেচার’ ছাড়ে। এই রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে সেই প্রোটিনগুলো সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে প্রতিটি অঙ্গের আলাদা ‘বায়োলজিক্যাল এজ স্কোর’ বের করা হয়। এর ফলে কোনো সাধারণ মানুষের বাহ্যিক বয়স কম হলেও তাঁর শরীরের কোনো নির্দিষ্ট অঙ্গ ভেতর থেকে কতটা বুড়িয়ে গেছে বা সচল রয়েছে, তার একটি নির্ভুল হিসাব পাওয়া যায়।
প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় সাধারণত কোনো অঙ্গের অনেকখানি ক্ষতি হওয়ার পর সমস্যা ধরা পড়ে, কিন্তু এই পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ দানা বাঁধার অনেক আগেই অঙ্গের অস্বাভাবিক ক্ষয় শনাক্ত করা যায়। এর ফলে চিকিৎসকরা সাধারণ স্বাস্থ্য পরামর্শের বাইরে গিয়ে প্রতিটি রোগীর জন্য আলাদা এবং সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনা বা জীবনযাত্রার পরিবর্তনের পরামর্শ দিতে পারেন। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হয়ে উঠবে, যা মানুষকে অসুস্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করে আগেভাগেই দীর্ঘমেয়াদী জটিল রোগ যেমন হৃদরোগ, কিডনির সমস্যা বা স্নায়বিক অবক্ষয়ের ঝুঁকি কমিয়ে দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবন যাপন করতে সাহায্য করবে।
প্রোটিওমিক্স প্রযুক্তির ব্যবহার: প্রচলিত পদ্ধতির মতো কেবল জন্ম তারিখের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং এই পরীক্ষাটি রক্তের প্রোটিন সিগনেচার বিশ্লেষণ করে কাজ করে।
অঙ্গভেদে ভিন্ন বয়স নির্ণয়: অনেক সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে সার্বিক বয়স ৪০ বছর হলেও, এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা যেতে পারে তাঁর হৃদপিণ্ড বা কিডনির বয়স হয়তো ৬০ বছরের মানুষের মতো বুড়িয়ে গেছে।
রোগের আগাম পূর্বাভাস: সাধারণ পরীক্ষার চেয়ে অনেক আগেই এই প্রযুক্তির সাহায্যে অঙ্গের অভ্যন্তরীণ অস্বাভাবিক ক্ষয় বা ভবিষ্যতের রোগের ঝুঁকি নির্ভুলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব।
সুনির্দিষ্ট ও ব্যক্তিগত চিকিৎসা: যদি কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট কোনো অঙ্গের বয়স তাঁর স্বাভাবিক বয়সের চেয়ে বেশি আসে, তবে চিকিৎসকরা সেই অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট ডায়েট, জীবনযাত্রা পরিবর্তন বা চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করতে পারেন।
ভবিষ্যতের প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা: মানুষ এখন আর অসুস্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবে না; বছরে একবার এই পরীক্ষা করিয়ে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে অঙ্গের বয়সের ওপর কী প্রভাব পড়ছে তাও ট্র্যাক করতে পারবে।
মন্তব্য করুন