ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা বা 'গোট' (GOAT - Greatest of All Time) কে এই চিরায়ত প্রশ্নে ফুটবল বিশ্ব মূলত দুই মেরুতে বিভক্ত। একপক্ষের চোখে এটি ব্রাজিলিয়ান ফুটবল সম্রাট পেলে, তো অন্যপক্ষের কাছে আর্জেন্টিনার জাদুকর লিওনেল মেসি। তবে ভিন্ন ভিন্ন যুগের এই দুই কিংবদন্তিকে একই দাঁড়িপাল্লায় এনে সরাসরি তুলনা করাটা কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আর্জেন্টিনার সাবেক তারকা ফরোয়ার্ড সার্জিও আগুয়েরো। তাঁর মতে, দুই যুগের ফুটবলের ধরন ও সুযোগ-সুবিধার আকাশ-পাতাল পার্থক্যের কারণে এই তুলনা করাটা বেশ কঠিন।
সম্প্রতি জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম টুইচে (Twitch) বিখ্যাত স্প্যানিশ স্ট্রিমার ইবাই ইয়ানোসের সাথে এক জমজমাট লাইভ আলাপচারিতায় অংশ নেন আগুয়েরো। সেখানে ইয়ানোস তাঁকে সরাসরি প্রশ্ন করেন—মেসি না পেলে, কার অবস্থান সবার ওপরে? এই প্রশ্নের জবাবে ম্যানচেস্টার সিটির সাবেক এই কিংবদন্তি স্ট্রাইকার সোজাসাপ্টা জানান, তিনি পেলের খেলা কখনোই সরাসরি দেখেননি, তাই সেই সময়ের পারফরম্যান্স নিয়ে ব্যক্তিগত কোনো রায় দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। তবে ফুটবল ইতিহাসের বিবর্তন বোঝাতে গিয়ে তিনি একটি মজার ও চমকপ্রদ তথ্য শেয়ার করেন। আগুয়েরো বলেন, "আমি কখনো পেলের খেলা দেখিনি। তিনি অবশ্যই অসাধারণ ছিলেন, কিন্তু আমি তাঁকে লাইভ খেলতে দেখিনি। আর তাছাড়া, তখনকার সময়ে গোলরক্ষকরা তো হাতে গ্লাভসও পরতেন না!"
আগুয়েরোর এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে আধুনিক ফুটবল ও পেলের যুগের ফুটবলের মধ্যকার কাঠামোগত ৪টি বড় পার্থক্য ও সীমাবদ্ধতা সামনে এসেছে:
১. সরঞ্জামের আধুনিকায়ন: পেলের সময়ে ফুটবলারদের বুট, বল কিংবা গোলরক্ষকদের সরঞ্জাম আজকের মতো উন্নত ছিল না। চামড়ার ভারী বল আর সাধারণ বুট দিয়ে তখনকার খেলোয়াড়দের টেকনিক প্রদর্শন করতে হতো।
২. নিয়মকানুন ও প্রযুক্তির অভাব: বর্তমান ফুটবলে অফসাইড রুলস, ট্যাকলিংয়ের ক্ষেত্রে কার্ডের কড়াকড়ি কিংবা ভিএআর (VAR) প্রযুক্তির কারণে খেলা অনেক বেশি সুশৃঙ্খল। পেলের যুগে রেফারিদের কড়াকড়ি কম থাকায় ফরোয়ার্ডদের ওপর প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারদের শারীরিক আক্রমণ বা ফাউলের মাত্রা ছিল অনেক বেশি সহিংস।
৩. ট্যাকটিক্যাল বিবর্তন: আধুনিক যুগের ফুটবল অনেক বেশি গতিশীল, বিজ্ঞানসম্মত এবং ডিফেন্সিভলি ট্যাকটিক্যাল। পেলের সময়ে দলগুলো অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ফরমেশনে খেলত, যার ফলে গোলের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে স্বাভাবিকভাবেই বেশি হতো।
৪. যুগের সীমাবদ্ধতা: যেকোনো খেলোয়াড়কে তাঁর নিজের যুগের সাপেক্ষেই বিচার করতে হয়। পেলে তাঁর যুগের চেয়ে বহুগুণ এগিয়ে ছিলেন বলেই তিনি ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ৩টি বিশ্বকাপ (১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০) জয়ের অনন্য কীর্তি গড়েছেন।
আগুয়েরোর এই মন্তব্যটি গণমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ার পর ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। অনেকেই পেলের যুগের ফুটবলকে 'সহজ' প্রমাণ করার চেষ্টা হিসেবে আগুয়েরোর এই মন্তব্যকে দেখছেন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আগুয়েরো মোটেও পেলের প্রতি কোনো নেতিবাচক বা অসম্মানজনক মন্তব্য করেননি। বরং তিনি পেলের প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই বাস্তবতার নিরিখে বোঝাতে চেয়েছেন যে, সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি সময় ও পরিকাঠামোয় খেলা দুজন অ্যাথলেটের মধ্যে পরিসংখ্যান দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করাটা অযৌক্তিক।
পরিসংখ্যান ও রেকর্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, পেলে তাঁর ক্যারিয়ারজুড়ে গোল ও বিশ্বকাপ ট্রফির দিক থেকে এক অবিশ্বাস্য উচ্চতা ছোঁয়া ট্র্যাডিশন তৈরি করে গেছেন। অন্যদিকে লিওনেল মেসি আধুনিক ফুটবলের সমস্ত কঠিন সমীকরণ, ব্যক্তিগত রেকর্ড, ব্যালন ডি'অর ও ক্লাব ট্রফির পাহাড় ডিঙিয়ে ২০২২ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারকে পূর্ণতা দিয়েছেন। আগুয়েরোর এই মন্তব্য শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ককে থামিয়ে না দিলেও এটি প্রমাণ করে যে, পেলে এবং মেসি উভয়ই নিজ নিজ যুগের ফুটবলীয় বিপ্লবের প্রধানতম দুই নায়ক।
মন্তব্য করুন