অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের পা থেকে বেরিয়ে আসা তীব্র গতির শটটি চিরতরে বদলে দিয়েছে স্পেনের ফুটবল ইতিহাস। বলটি প্রতিপক্ষের জালের ঠিকানায় জড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন থমকে গিয়েছিল পুরো স্টেডিয়ামের ঘড়ির কাঁটা। এক পলকে বিস্ফোরিত হয়েছিল নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়াম, গ্যালারির হাজারো উন্মত্ত দর্শক আর স্পেনের কোটি মানুষের রুদ্ধশ্বাস হৃদয়। তোরেসের জাদুকরী সেই একটিমাত্র গোলই স্পেনকে পৌঁছে দিয়েছিল বিশ্ব ফুটবলের পরম চূড়ায়।
১০৬ মিনিটের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তে পৌঁছানোর রোমাঞ্চকর এই গল্পটি শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে স্পেনের ভালেন্সিয়ার এক ছোট্ট শহরের সাধারণ মাঠে, যেখানে এক শিশু বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে বলের পেছনে ছুটত দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামার জন্য। ছোটবেলা থেকেই সবুজ গালিচায় বল পায়ে ফেরান তোরেসের অবিশ্বাস্য গতি, অদম্য সাহস আর জালের ঠিকানা চেনার সহজাত ক্ষুধা তাকে আলাদা করে সবার নজরে এনে দিয়েছিল। পরিবার, শৈশবের কোচ আর নিজের কঠোর পরিশ্রমের সিঁড়ি বেয়ে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন বড় কোনো মঞ্চে খেলার উপযোগী করে।
তোরেসের বর্ণাঢ্য ফুটবল জীবনের প্রথম বড় সাফল্যের অধ্যায় শুরু হয়েছিল ভালেন্সিয়া সিএফের বিখ্যাত একাডেমিতে। মূলত সেই ক্লাবের কাঠামোর মাঝেই তৈরি হয়েছিল তার ভবিষ্যতের শক্ত ভিত্তি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার গতির তেজ এবং নিখুঁত ড্রিবলিং তাকে সতীর্থদের ভিড়ে আরও বেশি উজ্জ্বল করে তোলে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ভালেন্সিয়ার মূল দলের হয়ে তার প্রতিযোগিতামূলক অভিষেক ঘটে। পরবর্তীতে ক্যারিয়ারের টানে তিনি পাড়ি জমান ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির জার্সিতে। এরপর আরও বড় পরিসরে নিজেকে প্রমাণ করতে যোগ দেন স্প্যানিশ জায়ান্ট এফসি বার্সেলোনাতে। ক্লাব ফুটবলের দীর্ঘ পথচলায় প্রশংসা ও সমালোচনার কণ্টকাকীর্ণ পথ পেরিয়েই তিনি আজ এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছেন।
তবে জাতীয় দলের হয়ে তোরেসের এই পথচলা কখনই মসৃণ ছিল না, বরং তা ছিল যথেষ্ট সংগ্রামমুখর। স্পেনের মতো বিশ্বমানের এবং তারকাখচিত একটি জাতীয় দলে নিয়মিত সুযোগ পাওয়া মুখের কথা নয়। কিন্তু তার অসাধারণ গতি, উইংয়ে দৌড়ানোর সহজাত ক্ষমতা এবং সবচেয়ে বড় কথা হলো ম্যাচের যেকোনো সংকটময় মুহূর্তে গোল করার অনন্য দক্ষতা তাকে দলের কোচদের আস্থার জায়গায় চিরস্থায়ী আসন করে দিয়েছিল।
খেলার সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ম্যাচ তখন ক্লান্তি ও অবসাদের শেষ প্রান্তে এসে ঠেকেছে। দুই দলের খেলোয়াড়দের ক্লান্ত পায়ে আর আগের মতো কোনো শক্তি অবশিষ্ট ছিল না; পায়ের পেশির লড়াই ছাপিয়ে তখন মাঠে কাজ করছিল কেবল অদম্য মানসিক শক্তি। পাসিংয়ে নিখুঁত সতর্কতা, ট্যাকলে সামান্য ভীতি আর প্রতি মুহূর্তে স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ ঠিক এমন এক দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতেই আসে সেই কাঙ্ক্ষিত সুযোগ। নিখুঁত বল নিয়ন্ত্রণ এবং বুলেট গতির এক দুর্দান্ত শট। চোখের পলকে বল জালে আশ্রয় নেয় এবং রচিত হয় সোনالی ইতিহাস। গোল করার সঙ্গে সঙ্গেই উল্লাসে ফেটে পড়ে দৌড় শুরু করেন তোরেস। দুহাত শূন্যে আকাশের দিকে তুলে ধরে জানান দেন জয়ের আনন্দ। ডাগআউট থেকে সতীর্থরা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেন। স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে উপস্থিত অচেনা মানুষগুলো একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ আনন্দের চোটে চিৎকার করছেন, আবার কেউ নিজের চোখকে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছেন না যে স্পেনের বহু বছরের কাঙ্ক্ষিত সেই অপেক্ষা সত্যি সত্যি ফুরিয়েছে।
ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে আবেগাপ্লুত তোরেস বলেছিলেন, ‘ছোটবেলা থেকে আমি এমন একটি বিশেষ মুহূর্তের স্বপ্ন দেখে এসেছি। দেশের হয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করার এই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এই গোল কেবল আমার একার নয়, এটি পুরো স্পেনের মানুষের। যখন দেখলাম বলটা জালে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে, তখন মনে হয়েছিল যেন থমকে গেছে চারপাশের সময়। মুহূর্তের জন্য চারপাশের সমস্ত কোলাহল ও চিৎকার হারিয়ে গিয়েছিল। কেবল একটাই বিষয় পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম, আমরা আমাদের সুদূর ইতিহাসের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।’
তবে গোল হওয়ার পরেও যেন পরীক্ষার শেষ ছিল না। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ের বাকি সময়টুকু ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক সময়। প্রতিটি সেকেন্ড তখন মনে হচ্ছিল একেকটি অনন্ত যুগের সমান। স্পেনের কোটি কোটি সমর্থক তখন গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে প্রার্থনায় লীন। বেঞ্চে বসে থাকা খেলোয়াড়দের চোখেমুখে স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সেই অন্তিম অপেক্ষা হয়ে উঠেছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত বাঁশি বাজে এবং সব বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। কেউ আনন্দের আধিক্যে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন ঘাসের ওপর, কেউ দুই চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জলের ধারা লুকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হন, আবার কেউ দুহাত আসমানের দিকে তুলে ধরে পরম করুণাময়কে কৃতজ্ঞতা জানান। সতীর্থরা এসে তোরেসকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে এক গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ করেন। সেই আলিঙ্গনে মিশে ছিল সীমাহীন আনন্দ, স্বস্তি, ত্যাগের চরম স্বীকৃতি আর ইতিহাস ছুঁয়ে দেখার এক অপার অনুভূতি।
যখন ফিফা বিশ্বকাপের জমকালো সোনালি ট্রফিটি স্পেনের অধিনায়কের উঁচিয়ে ধরা দুহাতে শোভা পায়, তখন সম্ভবত উপস্থিত সবার চোখের পলকেই ভেসে উঠেছিল খেলার সেই ১০৬ মিনিটের সোনালি মুহূর্তটি। বিশ্ব ফুটবলে ট্রফি জয়ের বড় বড় গল্প অনেক সময়ই কেবল একটি মাত্র গোল থেকেই জন্ম নেয়। বহু বছর বা যুগ পেরিয়ে গেলেও মানুষ হয়তো এই ফাইনাল ম্যাচের হাজারটা পাস, ট্যাকল বা মাঠের জটিল পরিসংখ্যান মনে রাখবে না। কিন্তু মানুষ ঠিকই মনে রাখবে সেই ১০৬ মিনিট। মনে রাখবে তোরেসের দুর্দমনীয় সেই দৌড়। মনে রাখবে দুই হাত আকাশের দিকে প্রসারিত করে করা তার সেই চিরস্মরণীয় উদ্যাপন।
ভবিষ্যতে হয়তো কোনো পিতা তার সন্তানকে গল্পচ্ছলে বলবেন, ‘জানো, আমি স্বচক্ষে সেই ঐতিহাসিক রাতটি দেখেছিলাম।’ কোনো ছোট্ট শিশু কম্পিউটারের বা মোবাইলের স্ক্রিনে বহু পুরনো সেই গোলের ভিডিও ক্লিপ দেখে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখবে। ফুটবল শেষ পর্যন্ত কেবলই গোলের একটি রোমাঞ্চকর খেলা। তবে কিছু কিছু গোলের প্রকৃত মূল্য কখনো সাধারণ স্কোরবোর্ডের অঙ্কে মাপা যায় না। কিছু গোল কালক্রমে হয়ে ওঠে একটি দেশের জীবন্ত স্মৃতি, একটি জাতির চিরন্তন গর্ব, একটি প্রজন্মের বুকভরা আবেগ আর অমূল্য শব্দমালা। ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেসের করা সেই ঐতিহাসিক গোলটিও ঠিক তেমনই এক মহাকাব্যিক গোল যে গোল শুধু স্পেনকে একটি বিশ্বকাপই জেতায়নি, বরং সময়ের অমর বুকেও নিজের জন্য তৈরি করে নিয়েছে চিরস্থায়ী এক সুউচ্চ আসন।
মন্তব্য করুন