সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা গাঢ় লাল রঙের মিয়াজাকি আম বর্তমানে বাংলাদেশের ফল চাষি ও শৌখিন বাগানীদের মধ্যে এক নতুন স্বপ্নের নাম। জাপানের কিউশু দ্বীপের মিয়াজাকি অঞ্চলে উৎপাদিত এই আমটি বিশ্বের সবচেয়ে দামি ফলগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। জাপানিরা একে আদর করে ডাকে ‘তাইয়ো নো তামাগো’ বা ‘সূর্যডিম’। এর অসাধারণ মিষ্টতা, মাখনের মতো নরম শাঁস এবং আকর্ষণীয় রঙের কারণে এটি বিশ্বব্যাপী অনন্য একটি ব্র্যান্ড। তবে জাপানের সেই দামি ফল এখন বাংলাদেশের মাটির গুণ ও কৃষিবিদদের প্রচেষ্টায় আমাদের বাগানেই বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে।
বাংলাদেশে এই সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন কৃষিবিদ মীর শাহীনুর রহমান। বিদেশে স্থায়ী হওয়ার সহজ সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি দেশের কৃষির প্রতি ভালোবাসার টানে ফিরে এসেছিলেন নাটোরের নিজের গ্রামে। ২০১৪ সালে জাপান থেকে মাত্র পাঁচটি সায়ান বা কলমের অংশ সংগ্রহের মাধ্যমে তিনি এই অভিযানের সূচনা করেছিলেন। শুরুর দিকে স্থানীয়ভাবে অনেকেই এই বিদেশি জাতের সফল চাষ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন এবং অনেক চারাগাছ মারা যাওয়ায় তিনি প্রতিকূলতারও সম্মুখীন হয়েছিলেন। তবে কঠোর পরিশ্রম ও গবেষণানির্ভর কৃষি পদ্ধতি তাকে শেষ পর্যন্ত সফল করেছে। বর্তমানে সারাদেশে ৫০ হাজারের বেশি মিয়াজাকির চারা বিক্রি হয়েছে এবং তিনি নিজেও একটি বিশাল বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তুলেছেন।
মিয়াজাকি আমের উৎপাদন জাপানে অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও প্রযুক্তিগত পরিবেশে করা হয়, যেখানে গ্রিনহাউস, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং আলোর প্রতিফলন ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে উৎপাদন ব্যবস্থা এবং জলবায়ু জাপানের চেয়ে ভিন্ন হওয়ায় এর বাজারমূল্যও ভিন্ন। যেখানে জাপানে এক জোড়া মিয়াজাকি আম চার লাখ টাকার বেশি দামে বিক্রি হওয়ার নজির রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে তা কেজিপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় সাধারণ মানুষের হাতের নাগালে পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের আবহাওয়ায় মিয়াজাকি চাষের উপযোগী মাটি ও পরিবেশ রয়েছে, তবে আন্তর্জাতিক মানের ফল পেতে উন্নত ব্যবস্থাপনা, সঠিক পরিচর্যা এবং মান নিয়ন্ত্রণের কোনো বিকল্প নেই।
এই আমের চাষাবাদ খুব একটা সহজ নয় কারণ এটি রোগবালাই ও পোকামাকড়, বিশেষ করে মাছির আক্রমণের প্রতি বেশ সংবেদনশীল। ড. মো. মেহেদী মাসুদসহ কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, মিয়াজাকির আসল লাল রঙ পাওয়ার জন্য প্রতিটি ফলে পর্যাপ্ত সূর্যালোক পৌঁছানো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। দেশের পার্বত্যাঞ্চলসহ সমতল এলাকাগুলোতেও এখন এই আমের চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মিয়াজাকি আমের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং চলতি অর্থবছরে এটি ৩০ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছেছে। যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পেলে মিয়াজাকি আম বাংলাদেশের কৃষিখাত ও রপ্তানি বাজারে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে।
মন্তব্য করুন