বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বর্তমানে খেলাপি ও অনাদায়ি ঋণ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নন-পারফর্মিং লোন বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। সাধারণ ভাষায়, কোনো ঋণের কিস্তি বা সুদ নির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৯০ দিন বা তার বেশি সময় বকেয়া থাকলে ব্যাংক সেটিকে খেলাপি ঋণ বা ‘ব্যাড লোন’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদের মতে, বৈশ্বিক মানদণ্ড ২ শতাংশ হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার তারল্য ও সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
ব্যাংকিং খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হলো ‘ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ’ বা ‘ডিস্ট্রেসড লোন’। সব ঝুঁকিপূর্ণ ঋণই কিন্তু সরাসরি খেলাপি ঋণ নয়; বরং এটি হলো এমন ঋণ যা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে শ্রেণিকৃত হয়নি, তবে গ্রাহকের আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভবিষ্যতে তা খেলাপিতে পরিণত হওয়ার উচ্চ আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি দেশের মোট স্থিতি ঋণের প্রায় ৬০ শতাংশই এই ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় চলে এসেছে, যার অর্থ দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ঋণই এখন স্বাভাবিক নিয়মে পরিশোধ হচ্ছে না। এই ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণগুলো আগেভাগে শনাক্ত করতে পারলে ব্যাংকগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি এড়ানোর সুযোগ পায়।
কোনো ঋণগ্রহীতা সাময়িক সংকটে পড়ে নির্ধারিত সময়ে কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে ব্যাংক বিশেষ শর্তে ঋণ পরিশোধের সময়সূচি নতুন করে নির্ধারণ করে দেয়, যাকে বলা হয় ‘ঋণ পুনঃতফসিল’ বা ‘লোন রিশিডিউলিং’। এই প্রক্রিয়ার আওতায় ডাউন পেমেন্ট বা নির্দিষ্ট অর্থ জমা দিয়ে ঋণের মেয়াদ বাড়ানো কিংবা কিস্তির সংখ্যা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া বারবার পুনঃতফসিলের সুযোগ দিলে প্রকৃত খেলাপি ঋণের বাস্তব চিত্র আড়াল হয়ে আর্থিক খাতের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তার নিয়মিত আয় বা সব সম্পদ বিক্রি করেও দেনা পরিশোধে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, তখন আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে ‘দেউলিয়াত্ব’ বা ‘ব্যাংকরাপ্সি’ ঘোষণা করা হয়। তবে দেউলিয়া হওয়া মানেই ঋণ মওকুফ নয়, বরং আদালতের মাধ্যমে তার অবশিষ্ট সম্পদ সুশৃঙ্খলভাবে বিক্রি করে ব্যাংকের পাওনা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা ও জামানত বাজেয়াপ্ত করা এবং যারা অর্থনৈতিক মন্দা বা যৌক্তিক কারণে সংকটে পড়েছেন, তাদের পুনঃতফসিল বা পরিচর্যার মাধ্যমে টিকিয়ে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা।
মন্তব্য করুন