সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ এর আশেপাশের এলাকায় একের পর এক ভূমিকম্পের ঘটনা জনমনে নতুন করে ভীতির সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে ২২ জুন সোমবার রাতে ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে ৪.৪ মাত্রার যে ভূমিকম্পটি হয়েছে, তা বিশেষজ্ঞদের ভাবনায় ফেলেছে। শুধু এটিই নয়, পহেলা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে এবং গত বছরের নভেম্বরে নরসিংদীতে হওয়া ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পগুলো ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থানের ঝুঁকিকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
কেন এই ঘনঘন ভূমিকম্প? ভূ-তাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প কোনো নির্দিষ্ট দিনে বা মুহূর্তে ঘটে না, বরং এটি দীর্ঘ সময়ের ভূ-তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার ফল। ঢাকার আশেপাশে যেসব ভূমিকম্প হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই মাঝারি বা নিম্ন মাত্রার। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন:
১. টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া: বাংলাদেশ তিনটি টেকটোনিক প্লেটের (ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ) সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত। ছোট ছোট কম্পনগুলো মূলত ভূ-অভ্যন্তরের শক্তির নিঃসরণ। ২. ফাটলের উপস্থিতি: বিশেষজ্ঞরা অনেকদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, ঢাকার নিচে এবং আশেপাশে বেশ কিছু সক্রিয় চ্যুতি বা ‘ফল্ট লাইন’ রয়েছে। বারবার কাছাকাছি উৎপত্তিস্থল থাকা সেই ফল্ট লাইনগুলোর সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত হতে পারে। ৩. বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস কি? যদিও ছোট ছোট কম্পন শক্তি নির্গত করে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি কমায় এমন একটি তত্ত্ব আছে, তবুও ভূ-তাত্ত্বিকরা মনে করেন এই ধরনের ঘনঘন কম্পন বড় কোনো বিপদের সংকেতও হতে পারে। নরসিংদীর ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্পটি গত কয়েক দশকের অন্যতম শক্তিশালী কম্পন, যা প্রমাণ করে যে আমাদের ভূ-অভ্যন্তর এখন বেশ অস্থির।
সচেতনতা ও করণীয় ঢাকার ঝুঁকি মূলত অতিরিক্ত জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে। শহরের অবকাঠামো ভূমিকম্প সহনশীল না হওয়ায় ছোট কম্পনও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন:
নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ (BNBC) কঠোরভাবে অনুসরণ করা।
পুরানো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
ভূমিকম্পের সময় ও পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার জন্য নিয়মিত মহড়া (Drill) আয়োজন করা।
শেষ কথা ঢাকাকে ঘিরে ঘনঘন ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এটি কি স্বাভাবিক টেকটোনিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি ভবিষ্যতে বড় কোনো ভূমিকম্পের পূর্বাভাস তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে এই পরিস্থিতি আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতিগুলোকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এখন সময় এসেছে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতি নেওয়ার।
মন্তব্য করুন