আমাদের জীবনে বাবাদের অসামান্য অবদান ও ত্যাগকে সম্মান জানাতে প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বব্যাপী বাবা দিবস পালন করা হয়। এই বিশেষ দিনটি পরিবারগুলোকে তাদের বাবাদের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চমৎকার সুযোগ করে দেয়। মায়েদের সাধারণত স্নেহ-মমতার প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও, বাবারা হলেন পরিবারের সেই নীরব ও শক্ত খুঁটি, যারা পুরো পরিবারকে সুরক্ষা, দিকনির্দেশনা এবং স্থিতিশীলতা প্রদান করেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাবারা নিজের চেয়ে পরিবারের স্বাস্থ্য ও কল্যাণের দিকেই বেশি নজর দেন, যা পরোক্ষভাবে তাঁদের নিজেদের জন্য বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনে।
পরিবারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে বাবারা প্রায়ই নিজেরা অসুস্থ হলেও ডাক্তারের কাছে যেতে দেরি করেন, প্রাথমিক শারীরিক উপসর্গগুলোকে উপেক্ষা করেন এবং নিজেদের মানসিক ও আবেগীয় স্বাস্থ্যের অবহেলা করেন। ভারতের গুরুগ্রামের ফোর্টিস মেমোরিয়াল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের প্রিন্সিপাল ডিরেক্টর এবং ইউনিট প্রধান ড. সতীশ কউল এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান যে, পিতৃত্ব শব্দটির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে দায়িত্ব ও ত্যাগ। প্রিয়জনদের মানসিক, আর্থিক ও শারীরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে গিয়ে অনেক বাবাই নিজের স্বাস্থ্যকে পেছনে ঠেলে দেন। এই ত্যাগ প্রশংসনীয় হলেও, এর জন্য তাদের চড়া ব্যক্তিগত মূল্য চোকাতে হয়। কাজের চাপ এবং পারিবারিক বাধ্যবাধকতার কারণে পুরুষরা প্রায়ই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান না, রোগের লক্ষণ লুকিয়ে রাখেন এবং মানসিক স্বাস্থ্যকে অবহেলা করে এক অস্বাস্থ্যকর জীবনধারা বেছে নেন, যা মোটেও কাম্য নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় সক্রিয়ভাবে কাটানো এবং পারিবারিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার জন্য বাবাদের সুস্থ থাকা সবার আগে জরুরি। একজন সুস্থ বাবা সন্তানদের সঙ্গে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন এবং নিজের শরীরের যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে সন্তানদের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। এর ফলে সন্তানরাও ছোটবেলা থেকেই আত্মপরিচর্যা ও সুস্থতার গুরুত্ব বুঝতে শেখে। এছাড়া সন্তান লালন-পালন ও পারিবারিক দায়িত্বের মানসিক চাপ দক্ষতার সঙ্গে সামলাতেও সুস্বাস্থ্যের বিকল্প নেই। ড. কউলের মতে, নিজের স্বাস্থ্যকে অবহেলা করার পরিণতি শুধু বাবাদের একার ওপর নয়, বরং তাদের ওপর নির্ভরশীল পুরো পরিবারের ওপরই পড়ে। শারীরিক ও মানসিক অবহেলার কারণে দীর্ঘস্থায়ী রোগ, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে, যা পরোক্ষভাবে পরিবারের যত্ন নেওয়ার ক্ষমতাকেই ব্যাহত করে। তাই বাবা দিবস কেবল একটি উদযাপনের দিনই নয়, বরং এটি বাবাদের নিজেদের স্বাস্থ্যের প্রতি সচেতন হওয়ার এবং পুরো পরিবারের সামগ্রিক কল্যাণ ও সুখ নিশ্চিত করার একটি জরুরি অনুস্মারক।
মন্তব্য করুন