ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বাতিল এবং ঐতিহাসিক রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফের একবার তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করলেন জম্মু ও কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ। তার অত্যন্ত জোরালো দাবি, ২০১৯ সালে নরেন্দ্র মোদি সরকার যদি জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল না করত এবং সেখানকার রাজ্যের মর্যাদা পুরোপুরি অক্ষুণ্ণ রাখত, তবে আজকের দিনে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের (PoK) সাধারণ মানুষই স্বেচ্ছায় ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার দাবিতে সোচ্চার হতেন। গত শনিবার (১৫ আগস্ট) শ্রীনগরে আয়োজিত ভারতের স্বাধীনতা দিবসের এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্যে একই সঙ্গে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের সাম্প্রতিক চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা, সেখানকার সাধারণ মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি এবং তীব্র ক্ষোভের বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
সীমান্তের ওপারের বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে ওমর আবদুল্লাহ বলেন যে, বহু বছর আগে কাশ্মীরের পূর্বপুরুষেরা যে সতর্কবার্তা দিয়ে রেখেছিলেন, আজকের দিনে এসে তা শতভাগ যথার্থ প্রমাণিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘হামলাবার খবরদার, হাম কাশ্মীরি হ্যায় তৈয়ার’ স্লোগান বা কথাটি আজও বর্তমান পরিস্থিতির জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের অন্তর্বর্তীকালীন শোচনীয় পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ও বেদনা প্রকাশ করে তিনি জানান যে, সেখানকার সাধারণ মানুষ যখন তাদের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার এবং ন্যায্য দাবিগুলোর পক্ষে মুখ খুলতে গেছেন, তখন শাসকগোষ্ঠীর দমনপীড়নে বহু মানুষকে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হয়েছে, অনেকে গুরুতর আহত হয়েছেন এবং অসংখ্য মানুষকে বিনা বিচারে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। ঠিক এই প্রসঙ্গ টেনেই তিনি ২০১৯ সালের কেন্দ্রীয় সরকারের সেই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন। মুখ্যমন্ত্রীর সুদৃঢ় বিশ্বাস, সে সময় বিশেষ মর্যাদা বাতিল বা রাজ্যের মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে যদি আগের সাংবিধানিক ব্যবস্থা ও স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা হতো, তবে ভূস্বর্গের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের জোয়ার দেখে ওপারের মানুষই স্বতঃস্ফূর্তভাবে জম্মু ও কাশ্মীরের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠত।
ভাষণে ওমর আবদুল্লাহ আরও উল্লেখ করেন যে, জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভায় পাক অধিকৃত কাশ্মীরের জনগণের প্রতিনিধিত্বের জন্য নির্দিষ্ট আসনগুলো এখনো নিয়ম অনুযায়ী ফাঁকা রাখা হয়েছে এবং তিনি আশাবাদী যে একদিন সেই শূন্য আসনগুলো সঠিক প্রক্রিয়ায় পূরণ হবে। তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, জম্মু ও কাশ্মীরের সঙ্গে পাক অধিকৃত কাশ্মীরের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রশ্নটিকে তিনি বর্তমান আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অমীমাংসিত একটি বিষয় হিসেবে দেখছেন। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট নরেন্দ্র মোদি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জম্মু ও কাশ্মীরের দীর্ঘদিনের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা বা ৩৭০ ধারা বাতিল করে দেয় এবং রাজ্যটিকে ভেঙে জম্মু-কাশ্মীর ও লাদাখ এই দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করে। দীর্ঘকালের ঐতিহ্যবাহী রাজ্যের মর্যাদা হারানোর পর থেকেই উপত্যকার মূলধারার রাজনীতিতে এই নিয়ে চরম অসন্তোষ ও আইনি লড়াই অব্যাহত রয়েছে। স্বাধীনতা দিবসের পবিত্র মঞ্চ থেকে মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহর এই কড়া ও দূরদর্শী মন্তব্য দেশজুড়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক ও আলোচনার ঝড় তুলেছে।
মন্তব্য করুন