দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যকার ‘বিশেষ সম্পর্ক’ বিশ্ব রাজনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যকার বৈরী সম্পর্ক ও নীতিগত মতপার্থক্য এই জোটকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের মধ্যে যে কৌশলগত ঐক্যের ভিত্তি ছিল, তা এখন চরম টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্তেজনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নতুন করে চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রবল আগ্রহ এবং লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান বন্ধের বিষয়টি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লেবাননে হামলা বন্ধের জন্য নেতানিয়াহুকে বারবার তাগিদ দিলেও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষেই অটল। সাম্প্রতিক অডিও ফাঁসের ঘটনায় ট্রাম্পের কঠোর ভর্ৎসনা এবং নেতানিয়াহুকে নিয়ে তাঁর বিরূপ মন্তব্য দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যকার দূরত্বকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ট্রাম্প সরাসরিই জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটনের সহায়তা ছাড়া ইসরাইলের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব।
শুধু ডেমোক্র্যাট বা উদারপন্থী নয়, ট্রাম্পের নিজের ‘ম্যাগা’ (MAGA) আন্দোলনের কট্টরপন্থি সমর্থকদের মধ্যেও ইসরাইলের প্রতি সমর্থন কমছে। টাকার কার্লসনের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা এখন খোলাখুলি বলছেন যে, ইসরাইলের নীতিসমূহ মার্কিন প্রশাসনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের জনমতও দ্রুত ইসরাইলের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে, যা গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী নিন্দার মুখে পড়া ইসরাইলের জন্য বড় ধাক্কা।
ইসরাইলের অভ্যন্তরেও এই কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতাকে নেতানিয়াহুর ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন বিরোধীদলীয় নেতারা। ইয়ার লাপিদ থেকে শুরু করে গাদি আইজেনকোটের মতো নেতারা সতর্ক করে বলছেন যে, নেতানিয়াহুর অপরিপক্ক পররাষ্ট্রনীতি ইসরাইলকে তার সবচেয়ে বড় ও একমাত্র নির্ভরযোগ্য মিত্রের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। সামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে ইসরাইল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ২০১৬ সালের সমঝোতা অনুযায়ী বছরে ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পাওয়ার বিষয়টি সেই সম্পর্কের মূল চালিকাশক্তি। এই সম্পর্কের ফাটল ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, এটি বলা মুশকিল যে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে পুরোপুরি ‘ছুড়ে ফেলছে’। বিশ্লেষক অ্যারন ডেভিড মিলারের মতে, ট্রাম্পের লক্ষ্য হতে পারে এমন কোনো বড় সাফল্য অর্জন করা, যা তার রাজনৈতিক ইমেজকে উজ্জ্বল করবে। তবে বর্তমান প্রশাসনের এই প্রকাশ্য অনাস্থা ও সমালোচনা ইসরাইলকে একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কূটনৈতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়া এবং ট্রাম্পের মতো একগুঁয়ে মিত্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার ফলে ইসরাইলের অস্তিত্বের সংকট যে নতুন রূপ নিচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য। এখন দেখার বিষয়, নেতানিয়াহু তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার টিকিয়ে রাখতে এই চাপের মুখে কতটা নমনীয় হন, নাকি শেষ পর্যন্ত এই মিত্রতা কোনো বড় ধরনের ভাঙনের দিকেই এগিয়ে যায়।
মন্তব্য করুন