সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভবিষ্যৎ ও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে দেশের রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দুটি আবেদন দাখিল, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ইসলামী ব্যাংকের অর্থ অনিয়মে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে হাই কোর্টে প্রতিবেদন দাখিলের খবর সামনে আসার পর থেকেই মূলত এই আলোচনা জোরালো হয়েছে। পদ ছাড়ার পর সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা বিচার করা সম্ভব কি না এবং তিনি বিদেশে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা আইনি প্রশ্ন।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি এবং তাঁর কার্যভারকালে ফৌজদারি কার্যক্রমের বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। অনুচ্ছেদের (১) দফায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি তাঁর দায়িত্ব পালনকালে কিংবা অনুরূপ বিবেচনায় কোনো কার্য করে থাকলে সেজন্য তাঁকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। অন্যদিকে (২) দফায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আদালতে কোনো প্রকার ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের বা চালু রাখা যাবে না এবং তাঁর গ্রেপ্তার বা কারাবাসের জন্য কোনো আদালত থেকে পরোয়ানা জারি করা যাবে না।
আইনজীবীদের মতে, এই সাংবিধানিক সুরক্ষা মূলত রাষ্ট্রপতি পদে থাকা অবস্থাকালের জন্য প্রযোজ্য। তবে পদ থেকে সরে যাওয়ার পর বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে এই সুরক্ষার সুযোগ থাকে না। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন মনে করেন, ব্যক্তিগত অপরাধের দায় রাষ্ট্রের নয় এবং দায়িত্ব পালনকালীন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা আদালতের ব্যাখ্যার বিষয়। আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জানান, পদে থাকাকালীন কোনো ঘটনা যদি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তবে পদ ছাড়ার পর সেই বিষয়ে আইনি পদক্ষেপ বা বিচারকার্য চালাতে কোনো বাধা নেই।
সাবেক রাষ্ট্রপতির আইনি সুরক্ষা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সচিবালয়ে সাংবাদিকদের জানান, সাংবিধানিক নিয়ম ও বিধিবিধান অনুসারে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সংবিধান অনুযায়ী তাঁর দায়মুক্তি রয়েছে। ফৌজদারি অপরাধ বা অন্য কোনো বিষয়ে আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা যায় না বলে উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সাবেক রাষ্ট্রপতি হিসেবে আইন অনুযায়ী তিনি এসএসএফ ও পিজিআরসহ অন্যান্য নিরাপত্তা এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা আগামী ছয় মাস পর্যন্ত পাবেন। অন্যদিকে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান চট্টগ্রাম এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, দুদকের কমিশনার ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক থাকাকালে মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে এবং সত্যতা মিললে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা তদন্তের দাবিতে দুটি পৃথক আবেদন জমা পড়েছে। বাংলাদেশ আজাদ পার্টির পক্ষ থেকে সাবেক দুই রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের দপ্তরে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। এছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালীন হত্যাযজ্ঞ এবং আওয়ামী লীগ আমলের গুম-নির্যাতনের ঘটনায় মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা ও দায় খতিয়ে দেখতে ‘রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম’ (এসডিএফ) আরেকটি আবেদন করেছে। অন্যদিকে, হাই কোর্টে দাখিল করা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বা বিএফআইইউ-এর প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার শেয়ার কেলেঙ্কারিতে মো. সাহাবুদ্দিন ও তাঁর কোম্পানি জেএমসি বিল্ডার্সের নাম উঠে এসেছে, যা নিয়ে উচ্চ আদালতে পরবর্তী শুনানির প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মন্তব্য করুন