জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার বড় ধাক্কায় এমনিতেই নাকাল অবস্থা পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের। এর ওপর চলমান তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যহারে কমাতে একের পর এক কঠোর ও কড়া সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির সরকার। পেট্রল ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি রাত ৯টার মধ্যে বাজার বন্ধ রাখা থেকে শুরু করে সরকারি গাড়ির তেল বরাদ্দ হ্রাস এবং বিদেশ সফরে নিষেধাজ্ঞা জারির মতো কঠোর পদক্ষেপে ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করেছে পাকিস্তানের দৈনন্দিন জনজীবন।
গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) পাকিস্তান সরকার প্রতি লিটার পেট্রলের দাম ৪.১০ পাকিস্তানি রুপি এবং হাই-স্পিড ডিজেলের দাম ৬.৪১ রুপি বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে বর্তমানে দেশটিতে প্রতি লিটার পেট্রল ৩৮৪.৩৪ রুপি এবং ডিজেল ৪১৫.৮৩ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে। এই মূল্যবৃদ্ধির মারাত্মক চাপ কিছুটা লাঘব করতে গত বুধবার থেকে সরকার ভর্তুকি চালুর ঘোষণা দিলেও সাধারণ মানুষ তা পেতে গিয়ে নানা জটিলতার মুখে পড়ছেন। গাড়ি বা মোটরসাইকেলে এই ভর্তুকি পেতে হলে গ্রাহকদের নির্দিষ্ট নম্বরে আগে রেজিস্ট্রেশন করতে হচ্ছে, যা নিয়ে ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। করাচির এক বাসিন্দা মোহাম্মদ মুশাররফ গণমাধ্যমকে জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোটরসাইকেলের নম্বর নিবন্ধন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষ পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন, যা অশিক্ষিত বা কম জানা মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব এক প্রক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই কঠিন অর্থনৈতিক সংকট ও লাগামছাড়া খরচ সামাল দিতে পাকিস্তান সরকার জ্বালানি ব্যবহার সীমিতকরণ এবং প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচনে যে সমস্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
গাড়িতে জ্বালানি বরাদ্দ হ্রাস: জরুরি সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর গাড়িগুলো বাদে বাকি সব সরকারি গাড়িতে জ্বালানি বরাদ্দ সরাসরি ৫০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে সময়সীমা: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে এখন থেকে রাত ৯টার মধ্যে সব সাধারণ বাজার ও শপিং মল বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে বিয়ের হলগুলো রাত ১০টা এবং রেস্তোরাঁগুলো রাত ১১টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে। ওষুধ ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং মেডিকেল ল্যাব এই বিধিনিষেধের আওতার বাইরে থাকবে।
বিদেশ ও অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ নিষিদ্ধ: সরকারি ব্যয় ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনতে মন্ত্রক ও বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তাদের যেকোনো ধরনের বিদেশ সফর এবং দাপ্তরিক কাজের জন্য দেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ধরনের ভ্রমণের বদলে এখন থেকে অনলাইনে ভার্চুয়াল সভা করার ওপর কঠোর জোর দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠান ও নৈশভোজে কড়াকড়ি: যেকোনো ধরনের সরকারি সভা-সমাবেশ, জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান এবং নৈশভোজের আয়োজনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তবে একান্তই বিদেশি কোনো অতিথি বা রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদলের সম্মানে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠান এর আওতামুক্ত থাকবে।
গাড়ি কেনায় নিষেধাজ্ঞা: সরকারি খরচে নতুন কোনো ধরনের মোটরগাড়ি বা যানবাহন কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর চাপ কমাতেই পাকিস্তান সরকার এই ধরনের মিতব্যয়ী পদক্ষেপগুলো নিয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগেও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে জ্বালানি ব্যবহার ও অপচয় রোধে বেশ কিছু কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল দেশটি। বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের জনজীবন আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন