সরকারের গ্যারান্টিযুক্ত প্রাইজবন্ডে বিনিয়োগে একসময় সাধারণ মানুষের ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও সময়ের বিবর্তনে তা এখন অনেকটাই কমেছে। শুধু বিনিয়োগ বা বিক্রিই কমেনি, বরং প্রাইজবন্ড থেকে মূল অর্থ ও লটারির মাধ্যমে মুনাফা বা পুরস্কার প্রাপ্তির হারও হ্রাস পেয়েছে। ফলশ্রুতিতে প্রাইজবন্ডের মাধ্যমে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে সরকারের সরাসরি ঋণ গ্রহণের প্রবণতাও নিম্নমুখী। পর্যাপ্ত প্রচারের অভাব এবং বাজারে প্রাইজবন্ডের তুলনায় অধিক লাভজনক ও সহজলভ্য বিভিন্ন সঞ্চয়ী উপকরণ থাকায় মানুষ এখন সেগুলোর দিকে বেশি ঝুঁকছেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রাইজবন্ডকে টিকিয়ে রাখতে এবং আগের আকর্ষণ ফিরিয়ে আনতে ১ হাজার টাকার মতো উচ্চমূল্যের ও আকর্ষণীয় পুরস্কারের প্রাইজবন্ড বাজারে আনা জরুরি।
১৯৭৪ সালে সাধারণ মানুষের জন্য সরকারের বিনিয়োগ বা সঞ্চয়ী মাধ্যম হিসেবে প্রথম প্রাইজবন্ড চালু করা হয়। বর্তমানে বাজারে ১০০ টাকা মূল্যমানের প্রাইজবন্ড প্রচলিত রয়েছে। অতীতে জন্মদিনের উপহার কিংবা নানা পারিবারিক উৎসবে প্রাইজবন্ড দেওয়ার প্রচলন বেশ জনপ্রিয় ছিল, কারণ এটি কেনা অত্যন্ত সহজ এবং যার কাছে থাকে তিনিই এর মালিক বলে গণ্য হন। নগদ টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, ডাকঘর ও সঞ্চয় অধিদপ্তর থেকে এটি কেনা যায় এবং এতে কোনো বিনিয়োগের সীমা নেই। প্রাইজবন্ডে কোনো নির্দিষ্ট সুদ দেওয়া হয় না, তবে প্রতি তিন মাস পরপর বছরে চারবার লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে প্রাইজবন্ডের ৪৬টি সিরিজ রয়েছে এবং প্রতিটি সিরিজের জন্য ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকার পুরস্কার বরাদ্দ থাকে। তবে ড্র হওয়ার দুই বছরের মধ্যে পুরস্কারের অর্থ দাবি করতে হয় এবং অর্থ স্থানান্তরের আগে ২০ শতাংশ আয়কর কেটে রাখা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় পরবর্তী অর্থবছরে প্রাইজবন্ড বিক্রির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ওই সময়ে ৯৯ কোটি ৩০ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড বিক্রি হলেও পরে তা কমে ৭৭ কোটি ৯০ লাখ টাকায় দাঁড়ায়, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিক্রি কমেছে প্রায় ২১.৫৫ শতাংশ। পাশাপাশি মূল অর্থ ও লটারির ড্র বাবদ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ায় সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার সক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে। প্রাইজবন্ডের এই জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে অন্যতম হলো প্রাইজবন্ড নিয়ে প্রচারণার অভাব, যার ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে এর ধারণা স্পষ্ট নয়। এছাড়া মূল্যস্ফীতির কারণে ১০০ টাকার নোটের বর্তমান বাস্তবতায় প্রাইজবন্ডের আকর্ষণ কমেছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে আরও লাভজনক ও আকর্ষণীয় বিভিন্ন সঞ্চয়ী স্কিম থাকায় গ্রাহকরা সেগুলোর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছেন। প্রাইজবন্ডকে বাঁচাতে এর যথাযথ প্রচার এবং মুনাফার ওপর থেকে কর প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন