চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার রাহাতিয়া দরবারসংলগ্ন ঐতিহাসিক ইছামতী বড় দীঘি, যা স্থানীয়দের কাছে ‘পরীর দীঘি’ নামে পরিচিত, শুক্রবার সেজেছিল এক অনন্য সাজে। পবিত্র আশুরা উপলক্ষে আয়োজিত এই শতবর্ষী মেলা ঘিরে পুরো এলাকায় ছিল উৎসবের আমেজ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষসহ সব বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো দীঘির পাড়। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রেখে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় এই আয়োজন।
পরীর দীঘিকে ঘিরে রয়েছে নানা লোকজ বিশ্বাস ও কিংবদন্তি। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, বহু আগে কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মরণে এখানে জারি গানের আসর বসত। সেই ধর্মীয় ও শোকাবহ আবহে গড়ে ওঠা ছোট ছোট দোকানপাটের সারিই সময়ের বিবর্তনে বিশাল গ্রামীণ মেলায় রূপ নিয়েছে। মেলায় আসা দর্শনার্থীদের জন্য শরবত বিতরণের রীতিটি এখনো অটুট রয়েছে, যা মেলার প্রধান ঐতিহ্যের অংশ। এছাড়া দীঘিটিকে ঘিরে প্রচলিত অলৌকিক নানা গল্প এই স্থানটিকে স্থানীয়দের কাছে আরও রহস্যময় ও আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
মেলায় আসা দর্শনার্থীদের জন্য বিনোদনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল প্রথাগত জারি গানের আসর। বিকালের দিকে স্থানীয় শিল্পীদের কণ্ঠে কারবালার ইতিহাস নিয়ে জারি গান পরিবেশন ছিল শ্রোতাদের জন্য বিশেষ মুগ্ধতার বিষয়। এছাড়া মেলায় ছিল খেলনা, মিষ্টি ও মুখরোচক খাবারের বাহারি দোকান। প্রবাসী থেকে শুরু করে স্থানীয়রা—সবাই তাদের পরিবারকে নিয়ে এই গ্রামীণ সংস্কৃতির স্বাদ নিতে ভিড় জমিয়েছিলেন।
রাঙ্গুনিয়ার এই মেলা কেবল কেনাবেচার কেন্দ্র নয়, বরং এটি ধর্মীয় অনুভূতি, লোকবিশ্বাস এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনস্থল। শতবর্ষ পেরিয়েও মেলাটি তার জৌলুস ও স্বকীয়তা ধরে রেখেছে। প্রতি বছর আশুরার দিনে এ মেলাটি রাঙ্গুনিয়ার মানুষের জীবনে নতুন করে গ্রামীণ ঐতিহ্যের স্পন্দন ও প্রাণশক্তি ফিরিয়ে আনে, যা আধুনিক নাগরিক যান্ত্রিকতার ভিড়েও লোকসংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করছে।
মন্তব্য করুন