বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশিত এক গবেষণায় উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া ৭৪ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিষণ্নতার বিভিন্ন মাত্রার লক্ষণ পাওয়া গেছে। ৪২২ জন শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত যৌথ এই সমীক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার ও পারিবারিক দূরত্বকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণদের একটি বড় অংশই নানা মাত্রার মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছেন। মানসিক স্বাস্থ্য ও গবেষণা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘বন্ধু’ (BONDHU) এবং ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ থিংক ট্যাংক’ (BYTT)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রকাশিত প্রাথমিক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ৭৪ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যেই বিষণ্নতার নানা লক্ষণ বিদ্যমান।
বুধবার (৪ নভেম্বর) বিকেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যায়লের মার্কেটিং বিভাগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সোসিও-ডেমোগ্রাফিক প্রেডিক্টরস অব ডিপ্রেশন অ্যামং ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইন বাংলাদেশ: এভিডেন্স ফ্রম রিগ্রেশন মডেলিং’ শীর্ষক এই সমীক্ষা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়।
গবেষণার তথ্য ও বিষণ্নতার মাত্রা: দেশের বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত কলেজের ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী ৪২২ জন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীর ওপর এই গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘DASS-21’-এর বাংলা স্কেল ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের বিষণ্নতার মাত্রা পরিমাপ করেছেন গবেষকেরা।
প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
মৃদু বিষণ্নতা: ১২.৩ শতাংশ
মাঝারি বিষণ্নতা: ২৮.৭ শতাংশ
তীব্র বিষণ্নতা: ১২.৩ শতাংশ
অত্যন্ত তীব্র বিষণ্নতা: ২০.৯ শতাংশ
ঝুঁকির প্রধান কারণ ও জীবনযাত্রার চিত্র: গবেষণায় দেখা গেছে, পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি, আত্মহত্যার চিন্তা, অনিয়মিত ঘুম ও খাদ্যাভ্যাস, ক্যাম্পাসে নিরাপত্তাহীনতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সরাসরি মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির জন্য দায়ী।
জরিপের বেশ কিছু উদ্বেগজনক তথ্য:
৫৪.৫% শিক্ষার্থী দিনে ৫ ঘণ্টার বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটান।
৮৭.৪% শিক্ষার্থী ঘুম থেকে ওঠার ৩০ মিনিটের মধ্যেই মোবাইল ফোন ব্যবহার শুরু করেন।
২৯.১% শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার জন্য দিনে ১ ঘণ্টাও সময় দেন না।
২২.৫% শিক্ষার্থী মানসিক চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং সেবা প্রয়োজন মনে করলেও তা গ্রহণ করতে পারছেন না।
পরামর্শ ও সুপারিশ: অনুষ্ঠানে ইয়ুথ থিংক ট্যাংকের সাধারণ সম্পাদক শেখ রিফাদ মাহমুদ ও সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদসহ অন্যান্য বক্তারা বলেন, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য কেবল একটি ব্যক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
গবেষক দল শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা পুনরুদ্ধারে দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গোপনীয়তা রক্ষা করে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু, পেশাদার কাউন্সেলিং সেবা সহজলভ্য করা, আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।