ফ্রান্সজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করা সহিংস বিক্ষোভ এবং ব্যাপক বিশৃঙ্খলার জন্য সরাসরি অভিবাসন নীতিকে দায়ী করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যদিও মাঠপর্যায়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ও সাধারণ মানুষের মূল দাবির সঙ্গে অভিবাসন ইস্যুর সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না বলে জানা গেছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) সকালে ফ্রান্সের বিভিন্ন প্রধান শহরের রাজপথে আগের রাতের ভয়াবহ সহিংসতার স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যায়। কোথাও পুড়ে যাওয়া গাড়ি ও ব্যারিকেড, কোথাও লুট হওয়া ভাঙচুর করা দোকানপাট, আবার কোথাও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত সরকারি স্থাপনা পড়ে ছিল। এমন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ এক বিস্ফোরক পোস্টে ফ্রান্সের বর্তমান অবস্থা নিয়ে কড়া মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘‘ফ্রান্স আজ জ্বলছে! সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বিশ্বের মানুষ, যাদের হৃদয়ে তীব্র ঘৃণা রয়েছে, তাদের বেপরোয়া অভিবাসন একসময়ের এই মহান দেশটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অনেক বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই এখনই সীমান্ত বন্ধ করুন এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা ও পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিন।’’
অথচ ফ্রান্সে চলমান এই বর্তমান অস্থিরতার আসল সূত্রপাত হয়েছিল মূলত শিক্ষার্থীদের একটি যৌক্তিক আন্দোলন থেকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকট দূর করা, ক্লাসের মান উন্নত করা এবং শিক্ষার পরিবেশ আধুনিক করার দাবিতে প্রথমে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামে। পরবর্তীতে তাদের এই দাবির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে বিভিন্ন শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠনের সদস্য এবং দেশের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও জনসেবার নিম্নমান নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষও যুক্ত হন।
মূলত লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, নিত্যপণ্যের অসহনীয় দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি বিভিন্ন সেবার বেহাল দশার প্রতিবাদেই দেশজুড়ে এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছিল।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই বিক্ষোভে দেশজুড়ে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে দেশটির অন্যতম প্রধান শ্রমিক সংগঠন সিজিটি (CGT)-এর দাবি অনুযায়ী, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারী সাধারণ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮ লাখের কাছাকাছি পৌঁছেছিল।
শুরুতে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল ও জমায়েত অনুষ্ঠিত হলেও একপর্যায়ে কিছু সুযোগসন্ধানী ও উশৃঙ্খল দল বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর, লুটপাট এবং সরকারি ভবনে হামলার মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালায়। তবে এসব সহিংসতা মূলত দেশজুড়ে চলা বৃহৎ বিক্ষোভের ফাঁকে ফাঁকে ঘটেছিল। এখন পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য ও আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলো বিশ্লেෂণ করে দেখা গেছে, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও জনসেবা নিশ্চিত করা,কোনোভাবেই অভিবাসন বন্ধ করা বা এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করা নয়।
ব্যাপক সহিংসতা ও ক্ষয়ক্ষতির পর রোববার দিনভর পরিস্থিতি কঠোর হাতে সামাল দিতে ব্যস্ত সময় পার করেছে ফরাসি প্রশাসন। দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় জানান, রাজধানীসহ দেশজুড়ে চলা অভিযানে ইতিমধ্যে প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ধ্বংসাত্মক ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের সঠিকভাবে শনাক্ত করে কঠোর আইনের আওতায় আনতে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশেষ করে রাজধানী প্যারিসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক গ্রেপ্তারের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। কেবল প্যারিসেই এ পর্যন্ত ৮৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ফ্রান্সের রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিরতা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগেও বিভিন্ন সময় ব্যঙ্গাত্মক ও খোলামেলা মন্তব্য করেছেন। কিছুদিন আগে এক নির্বাচনী প্রচারণাসভায় তিনি ফ্রান্সের ঐতিহাসিক বিপ্লব ও দাঙ্গার অতীত ইতিহাস টেনে দেশটিতে ভ্রমণের কথা রসিকতার সুরে বলেছিলেন।
সে সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, ‘‘চলুন সবাই মিলে ফ্রান্সে বেড়াতে যাই! জায়গাটা চমৎকার। সেখানে কোনো দাঙ্গা নেই, কোনো বিপ্লব নেই। অথচ বিপ্লব ঘটানোর জন্য ফ্রান্স যেন ভীষণ উপযুক্ত একটি জায়গা। কী অবিশ্বাস্য! চলুন, ফ্রান্সে গিয়ে আমরাও সেই বিপ্লবে যোগ দিই।’’
শুধু ডোনাল্ড ট্রাম্পই নন, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ফ্রান্সের বর্তমান সহিংসতার জন্য দেশের উদারপন্থী অভিবাসন নীতিকে প্রধানত দায়ী করে মন্তব্য করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে জেডি ভ্যান্স লেখেন, ‘‘পশ্চিমা উদারপন্থিরা তথাকথিত বৈচিত্র্য ও সহমর্মিতার অন্ধানুকরণে ফ্রান্সসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের নিয়ে এসেছে। কিন্তু তারা এই মানুষগুলোর স্থানীয় সমাজে দ্রুত মিশে যাওয়া এবং মৌলিক সংস্কৃতিগত সামঞ্জস্য বজায় রাখার মতো অত্যন্ত জরুরি বিষয়গুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে।’’
ভ্যান্স আরও যোগ করেন, ‘‘তাদের অনেক আগেই স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছিল যে এ ধরনের আত্মঘাতী নীতি অনুসরণ করলে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, কিন্তু তারা তখন আমাদের কথা শোনেনি। ফ্রান্স একটি অত্যন্ত সুন্দর দেশ, সেখানকার সাধারণ মানুষও দারুণ। আমি শুধু প্রার্থনা করি, তাদের কোনো ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থাপনা আগুনে পুড়ে যাওয়ার আগেই যেন দেশটি এই উন্মাদনা থামিয়ে দেয়।’’
মন্তব্য করুন