কর্মব্যস্ত নাগরিক জীবনের গতি বাড়াতে ‘জাদুর ঝাঁপি’ হয়ে দেখা দিয়েছে মেট্রোরেল। বর্তমানে উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২০ কিলোমিটারের মেট্রোরেল সচল থাকলেও ৩০সেরও বেশি বর্গকিলোমিটারের বিশাল এলাকაজুড়ে বিস্তৃত রাজধানীর বুকে মাত্র একটি মেট্রো দিয়ে পূর্ণাঙ্গ গতিশীলতা আনা সম্ভব নয়। এই বাস্তবতায় বড় ব্যয়ের বোঝা সত্ত্বেও জনস্বার্থে আধুনিক রাজধানী গড়ার লক্ষ্যে ঢাকাবাসীর জন্য আরও তিনটি নতুন মেট্রোরেল উপহার দিতে যাচ্ছে সরকার। বুধবার একনেক বৈঠকে অনুমোদিত এই প্রকল্পগুলোর কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং ২০৩৩ সালের মধ্যে সবগুলোর কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। তবে আশার কথা হলো, এর আগেই ২০৩২ সালের মধ্যে রাজধানীবাসী আরও একটি নতুন মেট্রোরেলের দেখা পাবে।
বুধবারের একনেক বৈঠকে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এগুলো হলো এমআরটি-১, এমআরটি-৫ (উত্তর) এবং সম্পূর্ণ নতুন প্রকল্প এমআরটি-৫ (দক্ষিণ)। এমআরটি লাইন-১ এবং লাইন-৫ উত্তর রুটের সম্মিলিত সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪ হাজার ২৪৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা, যা মূল অনুমোদনের তুলনায় ১ লাখ ১০ হাজার ৪৪৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা বেশি। অন্যদিকে, এমআরটি-৫ দক্ষিণ রুটের জন্য ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এই তিন প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৭ কোটি ২ লাখ টাকা। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি জানিয়েছেন, নগরায়ণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও আধুনিক গণপরিবহণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে সরকার শুধু এই তিনটিতেই থেমে থাকবে না, বরং ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় আরও মেট্রোরেল নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
প্রকল্পগুলোর বিস্তারিত রূপরেখা অনুযায়ী, দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১ বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১৯ সালে প্রকল্পটি অনুমোদিত হলেও নানা জটিলতায় এর কাজ পিছিয়ে এখন ২০৩৩ সাল নাগাদ শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় নির্ধারিত হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা, যার বড় অংশ জাইকার নমনীয় ঋণে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই রুটে মোট ২১টি স্টেশন (১২টি পাতাল ও ৭টি উড়াল) থাকবে এবং প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮ লাখ যাত্রী যাতায়াত করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি-৫ (উত্তর) রুটের সংশোধিত ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ১৩.৫ কিলোমিটার পাতাল ও ৬.৫ কিলোমিটার উড়ালপথ বিশিষ্ট এই রুটে মোট ১৪টি স্টেশন থাকবে এবং প্রতিদিন ১২ লাখ ৩০ হাজার যাত্রী যাতায়াতের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। প্রকল্পটি ২০৩২ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে, গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি-৫ (দক্ষিণ) রুটের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এই রুটের ১৫টি স্টেশনের মধ্যে ১১টি পাতাল ও ৪টি উড়াল হবে এবং প্রতিদিন ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী যাতায়াত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০৩৩ সালের আগস্টে।
তবে গণপরিবহণ ব্যবস্থার এই রূপান্তরে মেট্রোরেলের বিকল্প না থাকলেও প্রকল্পগুলোর বিশাল আর্থিক ব্যয়, জাপানি পেটেন্ট ও ঠিকাদার নির্বাচনের সীমিত সুযোগ এবং পাতাল রেলের উচ্চ পরিচালন ব্যয় নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ও শঙ্কা রয়েছে। বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, পাতাল রেলের রক্ষণাবেক্ষণ ও কৃত্রিম আবহাওয়া বজায় রাখতে সার্বক্ষণিক বিপুল পরিমাণ খরচ যুক্ত হবে। অপরদিকে সরকারের নীতি নির্ধারকদের মতে, নগরবাসীর স্বাচ্ছন্দ্য ও আধুনিক চলাচলের স্বার্থে এই বিশাল বিনিয়োগের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব সুদূরপ্রসারী এবং এটি ঢাকাকে পরিপূর্ণ একটি মেট্রোময় নগরীতে রূপান্তর করবে।
মন্তব্য করুন