চলতি বছরের শুরু থেকে কিউবার অর্থনীতির প্রধান খাতগুলোর ওপর ওয়াশিংটনের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হওয়ায় ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্রটিতে মানবিক সংকট এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত জানুয়ারি মাসে কিউবায় তেল সরবরাহ বন্ধের পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি প্রধান সরবরাহকারী ভেনেজুয়েলা থেকেও জ্বালানি আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটি বর্তমানে তীব্র জ্বালানি ঘাটতি ও বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। গত ২৩ জুলাই মার্কিন প্রশাসন বিশেষভাবে জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করে আরও কিছু কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের মানবিক প্রয়োজনের জন্যও জ্বালানি আমদানি অসম্ভব হয়ে উঠেছে। আনাদোলু এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে কিউবা অচিরেই ‘আরেকটি গাজা উপত্যকায়’ পরিণত হতে পারে বলে জোরালো সতর্কবার্তা দিয়েছেন জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে নিযুক্ত স্বাধীন একদল বিশেষজ্ঞ।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, খাদ্য এবং মৌলিক জ্বালানিকে কখনোই রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। বর্তমান সংকটে কিউবার পরিবহন, সেচ, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক পরিষেবাগুলো একসঙ্গে ভেঙে পড়ায় এর সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়ছে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রান্তিক গ্রামীণ কৃষকদের ওপর। হাভানার বিভিন্ন এলাকায় ময়লা-আবর্জনা জমে গিয়ে রোগের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকিও বহুলাংশে বেড়ে গেছে। গত মাসে কিউবা সফর করা মার্কিন কংগ্রেসের চার সদস্যও দেশটির বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে গাজার ভয়ানক মিল খুঁজে পেয়েছিলেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর গত ২০ জুলাই কিউবার একদলীয় শাসনব্যবস্থাকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে ওই প্রতিবেদনে হাভানা কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদে মদদ দিচ্ছে—এমন সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ নেই। বরং তাদের আশঙ্কা, নিরাপত্তাঝুঁকির দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক ও আদর্শিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই কিউবার ওপর এই বহুমাত্রিক চাপ বজায় রাখা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।
এদিকে কিউবার ওপর চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি লাতিন আমেরিকার আরেক দেশ কলম্বিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। কলম্বিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলার সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে নতুন নিরাপত্তা প্যাকেজের আওতায় দেশটিকে ১০০ কোটি ডলারের সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে কলম্বিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করা, যৌথ অভিযান জোরদার করা এবং প্রতিরক্ষা ব্যয়ের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করাই এই নতুন উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। কিউবার সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব ধরনের বৈরী কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল কিউবার অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, এটি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়।
মন্তব্য করুন