পবিত্র রবিউল আউয়াল মাস এলেই মুসলিম সমাজে রাসুলুল্লাহ সা.-এর জন্মবার্ষিকী, তাঁর প্রতি ভালোবাসা এবং ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এই সময়ে সমাজে প্রায়ই কিছু মনগড়া ও ভিত্তিহীন কথার প্রচলন শোনা যায়। এর মধ্যে অন্যতম একটি প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা হলো ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন করাকে কেউ বিদআত বললে নাকি তিনি কাফের হয়ে যান এবং এর ফলে নাকি তাঁর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক তথা স্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে তালাক হয়ে যায়! এ ধরনের কথার কোনো ইসলামি ভিত্তি আছে কি না এবং এই বিষয়ে শিউরে ওঠার মতো এই ভুল ধারণার প্রকৃত সত্য কী, তা নিয়ে সম্প্রতি এক বিশেষ ইসলামি প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন বিশিষ্ট দ্বীনি আলোচক শায়খ আহমাদুল্লাহ।
অনুষ্ঠানে প্রশ্নকর্তার এই উদ্বেগের জবাবে শায়খ আহমাদুল্লাহ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, ‘মিলাদুন্নবীকে বিদআত বললে মানুষ কাফের হয়ে যাবে বা তার স্ত্রী তালাক হয়ে যাবে’ এই কথাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও চরম হাস্যকর একটি অপপ্রচার। ইসলাম ধর্মে এ ধরনের কোনো বিধান বা ফতোয়ার দূরতম কোনো অস্তিত্বও নেই। যারা এ ধরনের কথা ছড়ান, তারা সম্ভবত বোঝাতে চান যে নবীজির প্রতি অবমাননা করলে ঈমান থাকে না। কিন্তু সুন্নাহর সঠিক পথ ধরে দ্বীনের নামে নতুন কোনো অপ্রয়োজনীয় সংস্কৃতি এড়িয়ে চলা তো উল্টো নবীজির খাঁটি আনুগত্যের প্রকাশ, কোনো অবমাননা নয়। রাসুল সা. বা তাঁর সাহাবিদের যুগে এই ধরনের জন্মবার্ষিকী পালনের কোনো প্রচলন ছিল না, তাই সাহাবিদের যুগে না থাকা সংস্কৃতি কেউ পরিহার করলে তাকে কাফের বা নবীর দুশমন ফতোয়া দেওয়া চরম অজ্ঞতা।
আলোচনায় রবিউল আউয়াল মাসের গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে শায়খ আহমাদুল্লাহ জানান যে, হিজরি বর্ষের তৃতীয় এই মাসটি রাসুলুল্লাহ সা.-এর ওফাতের মাস এবং বেশিরভাগ ইতিহাসবিদের মতে তাঁর জন্মেরও মাস। তবে জন্মতারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে, কারণ সেই প্রাচীন যুগে মানুষ জন্মসাল বা তারিখ বর্তমানের মতো গুরুত্ব দিয়ে লিখে রাখত না। কিন্তু ইন্তেকালের সময় সারা বিশ্ব জেনে গিয়েছিল যে তিনি আল্লাহর চূড়ান্ত রাসুল, যে কারণে তাঁর ওফাতের তারিখটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, কেবল রবিউল আউয়াল মাস এলেই দু-একটি মিলাদ পড়া বা বিশেষ প্রথা পালনের মাধ্যমেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং ইসলামে মূল নির্দেশ হলো সারা জীবন নবীজির সুন্নাহ নিখুঁতভাবে মেনে চলা এবং তাঁর আদর্শ নিজের জীবনে ধারণ করা।
নবীজির প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে আলোকপাত করে তিনি পবিত্র কুরআনের সুরা আলে ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, আল্লাহর ভালোবাসার একমাত্র মাপকাঠি হলো রাসুল সা.-এর সুন্নাহর পরিপূর্ণ অনুসরণ করা। বিদায় হজে নবীজি উম্মতকে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর সুন্নাহ শক্তভাবে আঁকড়ে ধরতে বলে গেছেন। এর বাইরে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু তৈরি করা হলে তাকে পরিভাষায় ‘বিদআত’ বলা হয়। যারা মিলাদুন্নবী উদযাপন করেন, তারা মূলত গভীর ভালোবাসা ও আবেগ থেকেই তা করেন, যা প্রশংসনীয় হলেও সুন্নাহসম্মত নয়। তাই ভিন্নমতের প্রতি ক্ষোভ বা শত্রুতা না রেখে সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। পরিশেষে তিনি বলেন, রবিউল আউয়াল মাস আমাদের কেবল জন্ম স্মরণ করার বার্তা দেয় না, বরং নবীজির চরিত্র, আদর্শ, ন্যায়বিচার ও পারিবারিক জীবনে তাঁর সুন্নাহর বাস্তব চর্চা করার শিক্ষা দেয়।
মন্তব্য করুন