ভারতজুড়ে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মের বিভিন্ন আন্দোলনকে নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার বা ‘হাইজ্যাক’ করা হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন বহুজন সমাজ পার্টির (বসপা) সুপ্রিমো ও উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মায়াবতী। মঙ্গলবার সংবাদমাধ্যমের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, দেশের শাসক ও বিরোধী উভয় শিবিরেরই রাজনৈতিক চক্রান্ত এবং প্রভাব থেকে দেশের শিক্ষার্থী ও নবপ্রজন্মের দূরে থাকা উচিত। তার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস উভয়েই তরুণদের এই আন্দোলনগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
মায়াবতীর এই তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থী ও তরুণদের বড় ধরনের আন্দোলনের পর সম্প্রতি ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতেও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এর মাত্র একদিন আগে উত্তরপ্রদেশের হাতরাসে একটি দলীয় সমাবেশ থেকে বসপার জাতীয় সমন্বয়ক ও মায়াবতীর উত্তরসূরি আকাশ আনন্দও তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছিলেন। মায়াবতী স্পষ্টভাবে জানান যে, দেশের শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে নিজেদের ভবিষ্যৎ ও বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে এবং বহুজন সমাজ পার্টি তাদের এই সমস্যাগুলোর বিষয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, তরুণদের সেই আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ফায়দা হাসিলের চেষ্টা চালাচ্ছে।
দিল্লির যন্তর মন্তরের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে মায়াবতী অভিযোগ করেন যে, আন্দোলনটি মূলত একটি বিশেষ উদ্যোগ বা সংগঠনের হাত ধরে শুরু হলেও পরবর্তীতে কংগ্রেস এবং তাদের সহযোগীরা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে সেটিকে দখল করে নেয়। তার দাবি, এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের সংসদের কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিজেপি ও কংগ্রেস কেউই তরুণদের প্রকৃত সমস্যার সমাধান নিয়ে আন্তরিক নয় বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সংসদে শাসক ও বিরোধীদের মধ্যে তৈরি হওয়া অচলাবস্থার পেছনেও গভীর রাজনৈতিক স্বার্থ লুকিয়ে থাকে। অনেক সময় সরকারের ব্যর্থতা ও ত্রুটি থেকে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি সরাতে সংসদ অচল করে দেওয়া হয় অথবা এর পেছনে সুদূরপ্রসারি ক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক পরিকল্পনাও কাজ করে। এমনকি শাসক ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সমঝোতার সম্ভাবনার কথাও উড়িয়ে দেননি বসপা প্রধান।
দিল্লির পাশাপাশি রাঁচির সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সেখানেও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর বিজেপি এবং তাদের মিত্ররা সেটিকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। মায়াবতীর মতে, দুই ক্ষেত্রেই তরুণদের প্রকৃত সমস্যা ও দাবিদাওয়ার চেয়ে দলীয় রাজনীতি অনেক বেশি প্রাধান্য পেয়েছে এবং নির্বাচনী স্বার্থকে সামনে রেখে আন্দোলনের মূল গতিপথ বদলে দেওয়া হয়েছে। দেশের তরুণদের সামনে আজ বেকারত্ব, মানসম্মত শিক্ষা, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার অনিয়ম এবং নিজেদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে একাধারে নানান জটিল প্রশ্ন রয়েছে। এসব মৌলিক সমস্যার সমাধান করা রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান দায়িত্ব হলেও, সেই দায়িত্ব পালনের পরিবর্তে আন্দোলনকে স্রেফ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের শিক্ষার্থী ও যুবসমাজই। পরিশেষে তরুণদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মায়াবতী বলেন, নবপ্রজন্মকে তাদের নিজ নিজ আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতেই রাখতে হবে এবং কোনো রাজনৈতিক দলের প্ররোচনা বা স্বার্থের কাছে কখনোই মাথা নত করা উচিত নয়।
মন্তব্য করুন