কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠে খেলা তখন শেষের পথে, ঘড়ির কাঁটায় বিকেল ৪টা বেজে ৫৮ মিনিট। আকাশে গাঢ় কালো মেঘের ঘনঘটা, আম্পায়ারদের মধ্যে চলছে আলোচনা আর ব্যাটাররা নিচ্ছেন পানির বিরতি। এমন এক থমথমে পরিস্থিতিতে ভারতীয় দলের তরুণ অধিনায়ক শুভমান গিল বাধ্য হলেন নিজের পরিকল্পনা বদলাতে। হাতে মাত্র ২.৪ ওভার বোলিং করা চকচকে নতুন বলটি থাকলেও তিনি পেসার প্রসিধ কৃষ্ণকে আক্রমণে আনতে পারেননি, কারণ কম আলোর কারণে পেসারদের বোলিং করা তখন অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে বাধ্য হয়ে ডিপ থেকে বল হাতে নিয়ে এলেন রবীন্দ্র জাদেজা। তবে প্রকৃতির খেয়ালে মাত্র তিনটি বল গড়ায় গড়ায়নি, এর আগেই মুষলধারে বৃষ্টি এবং আলোর স্বল্পতার কারণে দিনের খেলার সমাপ্তি টানতে হয়। খেলোয়াড়দের দ্রুত মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমে ফিরে যেতে হয়, যা দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর একটি টেস্ট দিনের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেওয়ারও সুযোগ দেয়নি।
এর আগের দিনটিতেও আবহাওয়া এমনই খামখেয়ালি আচরণ করেছিল এবং ভারত ইনিংস ঘোষণা করার পর দ্রুত দুই উইকেট হারিয়ে শ্রীলঙ্কা দল বেশ বিপাকে পড়েছিল। স্কোরবোর্ডে ১ রানে ১ উইকেট এবং পরে ৮ রানে ২ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে থাকা লঙ্কানদের ওপর তৃতীয় দিনে নতুন বল নিয়ে চড়াও হওয়ার দারুণ সুযোগ ছিল ভারতের সামনে। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেট মাঝেমধ্যে সমস্ত পূর্বনির্ধারিত চিত্রনাট্য বদলে দিয়ে নিজের মতো গল্প লিখে নেয়। দিন শেষে তরুণ ও ক্লান্ত ভারতীয় বোলাররা যখন ড্রেসিংরুমে ফিরে যান, তখন বোলিং কোচ মর্নে মরকেলের ছোট্ট অথচ বাস্তবসম্মত বার্তাটি সবার মনে গেঁথে যায় এটাই হলো সত্যিকারের টেস্ট ক্রিকেটের আসল রূপ, যেখানে স্ক্রিপ্ট মাঝেমধ্যেই ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
বর্তমান সিরিজের শুরু থেকেই তরুণ ও অপেক্ষাকৃত কম অভিজ্ঞ এই শ্রীলঙ্কান দল যেভাবে ব্যাট হাতে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, তা ভারতীয় বোলারদের জন্য নতুন কিছু নয়। এর আগেও গলে ও কলম্বোর উইকেটে অতিরিক্ত বাউন্স কাজে লাগিয়ে মোহাম্মদ সিরাজকে ছাপিয়ে পেস আক্রমণে বড় ভরসা হয়ে উঠেছেন লম্বা দীর্ঘগতির পেসার প্রসিধ কৃষ্ণ। দিনের শুরুতেই তিনি কামিল মিশারাকে ফিরিয়ে দিয়ে ভারতের হয়ে দারুণ সূচনা এনে দেন। অন্যদিকে, কুলদীপ যাদবের অনুপস্থিতিতে একাদশে সুযোগ পাওয়া অফ স্পিনার অংশুমান বা সারংশ জৈন কিছুটা স্নায়ুর চাপে ভুগে শুরুর দিকে নো-বল করলেও ধীরে ধীরে নিজের ছন্দ খুঁজে পান। যদিও তিনি কাঙ্ক্ষিত প্রথম টেস্ট উইকেটের দেখা পাননি, তবুও তার কৃপণ বোলিং এবং বৈচিত্র্যময় গ্রিপ লঙ্কান ব্যাটারদের বেশ পরীক্ষা নিয়েছে।
দিনের খেলা গড়ানোর সাথে সাথে শুভমান গিল তার বোলারদের ব্যবহারে বেশ মুন্সিয়ানা দেখান। মানব সুতার এবং রবীন্দ্র জাদেজার পাশাপাশি স্পিন আক্রমণে নানা বৈচিত্র্য আনা হয়। তবে শ্রীলঙ্কার ব্যাটারদের মধ্যে বিশেষ করে সোনালি দিনুশা যেভাবে সুইপ, রিভার্স সুইপ এবং স্লগ সুইপের পসরা সাজিয়েছিলেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয় ছিল। পুরো সিরিজে তার এই শটগুলোর কার্যকারিতা ভারতীয় বোলারদের দীর্ঘক্ষণ সাফল্যের বাইরে রেখেছিল। এছাড়া পাসিন্দু সুরিয়া বান্দারার অত্যন্ত পরিপক্ব ও দায়িত্বশীল ব্যাটিং লঙ্কানদের ইনিংসকে শক্ত ভিত ওপর দাঁড় করায়। ভারত নিয়মিত বিরতিতে উইকেট তুলে নিলেও শ্রীলঙ্কার লোয়ার অর্ডার ও মিডল অর্ডার ব্যাটাররা যেভাবে ছোট ছোট অথচ কার্যকরী জুটি গড়ে তুলেছে, তাতে ম্যাচ থেকে খুব একটা ছিটকে যায়নি স্বাগতিকরা।
সারাদিনে ছয়টি উইকেট তুলে নিলেও এবং ওভারপ্রতি রান ৩.১৮ এর মধ্যে আটকে রাখলেও ভারতের আক্ষেপ থাকতে পারে যে তারা খেলাটিকে পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। বৃষ্টির চোখরাঙানি এবং অনিশ্চয়তার মাঝেই দিন শেষ করেছে দুই দল। তবে এটি স্পষ্ট যে কলম্বো টেস্টের এই লড়াইয়ে রোমাঞ্চের শেষ কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা দেখতে হলে শেষ দুই দিনের খেলার জন্য অপেক্ষা করতেই হবে।
মন্তব্য করুন