দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার জনপ্রিয় তারকা ‘রকিং স্টার’ যশের নতুন সিনেমা ‘Toxic: A Fairy Tale for Grown-Ups’ মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই সিনেপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রায় পাঁচ দশক জুড়ে বিস্তৃত এবং ১৯৪ মিনিটের দীর্ঘ এই গ্যাংস্টার অ্যাকশন সাগাটি আদতে একটি সম্পূর্ণ গল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা বর্তমান সময়ের প্যান-ইন্ডিয়া সিনেমার যুগে বেশ বিরল। তবে এত বিশাল আয়োজন এবং দুর্দান্ত তারকাশিল্পী থাকা সত্ত্বেও ছবিটি দর্শকদের কতটা সন্তুষ্ট করতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকরা। কানাড়া এবং ইংরেজি ভাষায় একযোগে নির্মিত এই সিনেমাটির দৃশ্যপট সাজানো হয়েছে ১৯২০ থেকে ১৯৪৭ সালের ব্রিটিশ ভারতের পটভূমিতে, যেখানে গোয়ার সাবেক পর্তুগিজ বন্দরকে মাদক ব্যবসার একটি অভিনব আস্তানা হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ১৯২০-এর দশকের শিকাগো শহরের আদলে তৈরি স্যুট, ফেডোরা হ্যাট এবং টমি গানের আবহ ছবিটিকে দৃশ্যত অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জমকালো রূপ দিলেও এর ভেতরের গল্প ও নির্মাণশৈলী অনেকটাই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।
সিনেমার গল্প শুরু হয় এক সার্কাসের প্রেক্ষাপট থেকে, যেখানে তরুণ এক বালক ‘টিকেট’-কে (যাকে বিষণ্ণ ক্লাউনের মতো সাজানো হয়েছে) তার মা নাদিয়া (কিয়ারা আদভানি) এক প্রতিশোধপরায়ণ বাবা রায়া (যশ)-এর হাতে তুলে দেন। এই টানটান উত্তেজনাকর সূচনার পর থেকেই দর্শকদের মনে গভীর কৌতূহল তৈরি হয়। কিন্তু গল্পের গভীরে যাওয়ার সাথে সাথেই গোয়ার মাদক সাম্রাজ্যের দখল নিয়ে চলা ক্ষমতার লড়াই, পর্তুগিজ গ্যাংস্টার এবং পরিবারের নানা জট পাকানো সম্পর্কের সমীকরণগুলো এত দ্রুত সামনে আসতে থাকে যে তা দর্শকদের জন্য বেশ বিভ্রান্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে, ছবির দৃশ্য সম্পাদনা বা এডিটিং এতটাই ছন্নছাড়া ও দ্রুতগতির যে পর্দায় কে কার সাথে লড়ছে কিংবা কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, তা পরিষ্কার বুঝতে বেশ হিমশিম খেতে হয়। অঝোর বর্ষণ আর তুষারপাতের মাঝে ধারণ করা দৃশ্যগুলোতে যশের উপস্থিতি এবং তার দ্বৈত চরিত্রে (পিতা রায়া ও পুত্র রুমি বা টিকেট) দুর্দান্ত অভিনয় কিছুটা স্বস্তি দিলেও এলোমেলো চিত্রনাট্যের কারণে পুরো অভিজ্ঞতাটি বেশ ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে।
ছবির অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো এর দৃশ্যগত এবং বর্ণনামূলক উপস্থাপনা। পরিচালক গীতু মোহান্দাস এর আগে অত্যন্ত প্রশংসিত 'মুথোন' সিনেমা উপহার দিলেও 'টক্সিক' চলচ্চিত্রে যেন স্টুডিও সিস্টেম ও মাস কমার্শিয়াল ফর্মুলার অতিরিক্ত চাপের ছাপ স্পষ্ট। ছবিতে ভরপুর অ্যাকশন, রক্তপাত এবং পুরুষতান্ত্রিক মারদাঙ্গার উপস্থিতি থাকলেও চরিত্রগুলোর মধ্যকার সম্পর্ক বা পারস্পরিক গতিপ্রকৃতি বোঝা এক প্রকার অসম্ভব গোলকধাঁধায় পরিণত হয়। তাছাড়া ছবিটির সংগীত পরিচালনাও যেন নব্বই ও দুই হাজারের দশকের আন্তর্জাতিক সিনেমাগুলোর হুবহু অনুকরণ, যার নিজস্ব কোনো মৌলিক বা স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি হয়নি। তবে এর মাঝেও যশের নিখুঁত অভিনয় এবং তার চরিত্রের ভেতরে থাকা আত্মঘৃণা ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দর্শকদের নজর কাড়ে। সব মিলিয়ে, নিখুঁত পরিচালনা ও সুবিন্যস্ত চিত্রনাট্যের অভাবে বিশাল বাজেট ও তারকাবহুল এই সিনেমাটি তার প্রকৃত সম্ভাবনা ফুটিয়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত দর্শকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী কোনো দাগ কাটতে পারেনি।
মন্তব্য করুন