দেশের চলমান গভীর অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং দ্রুত অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পুনর্গঠনের একটি সুনির্দিষ্ট তিন ধাপের কৌশল ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি সংস্কার ও উন্নয়ন কৌশলগত কাঠামোর আওতায় প্রণীত এই তিন ধাপের মধ্যে রয়েছে রিকভারি বা পুনরুদ্ধার, রেস্টোরেশন বা পুনঃস্থাপন এবং দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য পুনর্গঠন বা ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসিলারেশন’। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উপদেষ্টা জানান যে এই পর্যায়গুলো সফলভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে পুরোপুরি স্থিতিশীলতায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এই কৌশলের প্রথম ধাপ অর্থাৎ ‘রিকভারি’ বা পুনরুদ্ধারের মূল লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে অর্থনীতির হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধার করা এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকট যেমন ঋণের চাপ, তারল্যসংকট, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা। ইতোমধ্যে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সঠিক সমন্বয়, কর ফাঁকি রোধ এবং করের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, টাকার মান শক্তিশালী হওয়া, প্রবাস আয় বা রেমিট্যান্স বাড়া এবং সুদের হার হ্রাসের মতো ইতিবাচক সূচকগুলো এই পুনরুদ্ধারের পথকে আরও সুগম করছে।
দ্বিতীয় ধাপ অর্থাৎ ‘রেস্টোরেশন’ বা পুনঃস্থাপন পর্যায়ে অর্থনীতিকে কেবল স্থিতিশীল রাখাই নয়, বরং একে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে। এই ধাপে উৎপাদন, নতুন বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-এশিয়ার একটি মূল অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে কৃষি, ইলেকট্রনিকস, ওষুধশিল্প, চামড়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল খাতের মতো উৎপাদনমুখী খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার রূপরেখাও প্রস্তুত করা হয়েছে।
সর্বশেষ তৃতীয় ধাপ তথা ‘রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাকসিলারেশন’ বা দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সম্পন্ন করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বড় ধরনের রূপান্তর ঘটানোর পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সৌরবিদ্যুৎ ও নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে সরাসরি জ্বালানি উৎপাদক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে এই তিন ধাপের ধারাবাহিক কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বর্তমান সংকট কাটিয়ে বাংলাদেশকে একটি স্থিতিশীল, উৎপাদনশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শক্তিশালী অর্থনীতিতে রূপান্তর করার চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।
মন্তব্য করুন