হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারকে ঘিরে দীর্ঘকাল ধরে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী অপরাধ সাম্রাজ্য। প্রায় ৫০০ খাদেমের একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট মাজারের দান-অনুদান, মানতের গবাদিপশু এবং ধর্মীয় সামগ্রী নিয়ে চালাচ্ছে কোটি টাকার বাণিজ্য। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের নজরদারি ও অনুসন্ধানে এই মাজারকেন্দ্রিক ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
দানবাক্সে লুটপাটের চিত্র দীর্ঘদিন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি না থাকায় মাজারের দানবাক্সের টাকা সরাসরি প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে চলে যেত। জনমনে অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৮ জুন মাজারের তিনটি ডেক ও চারটি দানবাক্স সিলগালা করে দেয় জেলা প্রশাসন। ২২ জুন সিসিটিভি ক্যামেরার নজরদারিতে সেগুলো খোলার পর মাত্র ৪ দিনে পাওয়া যায় প্রায় ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। পরবর্তীতে ১১ জুলাই আবারও গণনা করলে পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা। মাত্র ২৫ দিনের হিসেবেই প্রায় ৬৪ লাখ টাকার অধিক নগদ অর্থ এবং বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। সাবেক জেলা প্রশাসক সারোয়ার আলম জানান, মাজারের সংশ্লিষ্টরা দানবাক্সের বাইরেও সরাসরি ভক্তদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা কৌশলে আত্মসাৎ করতেন।
অপরাধ নেটওয়ার্কের মূলে যারা অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাজারের দৈনিক আয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে ৩০ জনের একটি প্রভাবশালী গ্রুপ, যার নেতৃত্বে রয়েছেন কেরানি সামুন মাহমুদ খান ও খোকন ওরফে বকরি খোকন। তাদের আশ্রয়ে থাকা ৪ জন দুর্ধর্ষ অপরাধী মনি, কুতুব, বাবুল ও মিলন মাজার প্রাঙ্গণের পকেটমার, ছিনতাইকারী ও জুতাচোর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়াও মাজারে আসা সাধারণ ভক্তদের নানাভাবে হয়রানি করে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে হেড বাবুর্চি সোহেলের বিরুদ্ধে।
মানতের পশু ও গিলাফ বাণিজ্য মাজারে ভক্তদের দেওয়া মানতের পশু নিয়েও চলছে রমরমা জালিয়াতি। একটি পশু একাধিকবার বিক্রির নজির রয়েছে। এছাড়া ভক্তদের কেনা দামি গিলাফ ও গোলাপজল সরিয়ে নিয়ে পুনরায় চড়া দামে বিক্রির মাধ্যমেও হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লক্ষ লক্ষ টাকা। মাজারের সম্পত্তি যেমন মার্কেট, দোকানপাট ও পুকুর থেকে আসা আয়েরও কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনের পদক্ষেপ ও তদন্ত মাজারের অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে সিলেটের বর্তমান জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন একটি কমিটি গঠন করেছেন, যারা আগামী এক মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট জানিয়েছে, কমিশন গঠনের অপেক্ষায় তারা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান প্রশাসন কর্তৃক সিলগালা ও সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টিকে ‘অনভিপ্রেত’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ধর্মপ্রাণ মানুষদের ভক্তি ও শ্রদ্ধার জায়গাটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই অপরাধ নেটওয়ার্কের মূলোৎপাটন এবং স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনাই এখন স্থানীয়দের প্রধান দাবি। সরকারি তদন্তের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন