নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতির ভিড়ে মারাত্মক সব অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র সামনে এসেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি বড় প্রকল্পে। দেশের পৌরসভা ও শহর অঞ্চলে নাগরিক সেবা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ‘নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন (আইইউজিআইপি)’ প্রকল্পে এই হরিলুটের তথ্য উঠে এসেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের পৃথক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।
৬ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের এই বিশাল প্রকল্পের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে নানা গলদ এবং সমন্বয়হীনতার প্রমাণ মিলেছে। সবচেয়ে অবাক করা সমন্বয়হীনতার ঘটনা ঘটেছে মেহেরপুরের গাংনী পৌরসভার চৌগাছা এলাকায়। সেখানে একই প্রকল্পের আওতায় সড়ক ও নালার কাজ আলাদা প্যাকেজে নেওয়া হলেও পরে দেখা যায় নালা নির্মাণের জন্য কোনো জায়গাই নেই। ফলস্বরূপ, সদ্য নির্মিত নতুন পিচঢালা রাস্তা কেটে এখন নালা নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সরকারি বিপুল অর্থের অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে চরম জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে।
প্রকল্পের ক্রয় কার্যক্রমেও বড় ধরনের দুর্নীতির চিত্র স্পষ্ট হয়েছে। অডিট আপত্তিতে অস্বাভাবিক ও চড়া দামে নিম্নমানের ডাস্টবিন কেনা এবং কোনো ধরনের যথাযথ পরীক্ষা ছাড়াই সেগুলোর বিল পরিশোধের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, এতে দুই ধরনের ডাস্টবিন কেনা হয়েছে—যার মধ্যে ২০ লিটারের ২ লাখ ৫২ হাজারটি ডাস্টবিনের প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ৬৮০ টাকা এবং ১২০ লিটারের ২৫ হাজার ২০০টি ডাস্টবিনের প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ বাজারদর যাচাই করে দেখা গেছে, এসব ডাস্টবিন প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দামে কেনা হয়েছে।
ঠিকাদার নিয়োগের ক্ষেত্রেও চরম অনিয়মের আশ্রয় নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। নিয়মের তোয়াক্কা না করে সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ না দিয়ে এমন এক ঠিকাদারকে কাজটি দেওয়া হয়েছে, যিনি সেই সময় সরকারি কাজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বহিষ্কৃত ছিলেন। এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫০ লাখ টাকার বেশি। এছাড়া নির্দিষ্ট সময়ে কাজ সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হওয়া সত্ত্বেও ঠিকাদারের জামানত বাজেয়াপ্ত না করে উল্টো বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে আরও ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের চুক্তি অনুযায়ী অফিস ভাড়া না দেওয়া এবং উৎসে আয়কর কর্তন না করার মাধ্যমেও বড় অংকের রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। সবমিলিয়ে মাত্র পাঁচটি অডিট আপত্তিতেই প্রায় ২১ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে।
মাঠপর্যায়ে নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে সড়কের সঠিক ঢাল ও বাঁকের উঁচু-নিচু মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি, যা যান চলাচল ও সড়কের দীর্ঘস্থায়িত্বকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর ও আলমডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় নালার খোলা গর্ত, নিরাপত্তাবেষ্টনী বা রেলিং না থাকা, ম্যানহোলের ঢাকনা উধাও হয়ে যাওয়া এবং নির্মাণবর্জ্য জমে নালার কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার মতো বিপজ্জনক চিত্রও উঠে এসেছে। সরকারের পক্ষ থেকে ইটের ব্যবহার নিষিদ্ধের জোরালো নির্দেশনা থাকলেও তা উপেক্ষা করে বিভিন্ন স্থানে ইট ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।
প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণেও রয়েছে বড় ধরনের গরমিল। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) যেখানে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার সড়ক ও ৯০০ কিলোমিটার নালা নির্মাণের লক্ষ্য উল্লেখ ছিল, পরবর্তীতে অনুমোদিত প্রকল্পে তা কমে যথাক্রমে ১ হাজার ৩৭ কিলোমিটার ও ৪৩৭ কিলোমিটারে নেমে আসে। এছাড়া প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল নারী ও পুরুষের সুষম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, বিশেষ করে দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় কার্যক্রমে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক হলেও প্রায় ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
সার্বিক এই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) তোফায়েল আহমেদ জানিয়েছেন যে অডিট আপত্তিগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক জবাব দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কাজের ক্ষেত্রে উত্থাপিত অভিযোগগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মন্তব্য করুন