আশির ও নব্বইয়ের দশক থেকে ‘নতুন কুঁড়ি’ নামটি আমাদের সংস্কৃতি ও শৈশবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গান, আবৃত্তি, অভিনয় ও নৃত্যের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিভা অন্বেষণের এই জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মটি দীর্ঘদিন ধরে বহু খ্যাতনামা শিল্পীকে উপহার দিয়েছে। তবে সময়ের সাথে সাথে সেই ঐতিহ্যের পরিধি এবার প্রসারিত হয়েছে ক্রীড়াঙ্গনেও। সংগীত ও সংস্কৃতির গণ্ডি পেরিয়ে প্রথমবারের মতো শুরু হয়েছে ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’ নামের জাতীয় প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি, যা ইতোমধ্যে সারা দেশে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ক্রীড়া ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তনের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে। বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায় থেকে নতুন ও প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদদের খুঁজে বের করার লক্ষ্যে দেশজুড়ে একসঙ্গে আটটি ডিসিপ্লিনে এমন বড় পরিসরের উদ্যোগ দেশের ক্রীড়া ইতিহাসে বিরল। গত ২ মে শুরু হওয়া এই বর্ণাঢ্য আয়োজনটির পর্দা নামে ২৭ জুলাই। প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার কিশোর-কিশোরীর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী এই প্রতিযোগীদের নিয়ে দেশের প্রতিটি প্রান্তে সৃষ্টি হয়েছিল এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
উপজেলা পর্যায়ে অনলাইন নিবন্ধন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে খেলোয়াড় বাছাইয়ের পর স্থানীয় কোচদের তত্ত্বাবধানে জেলা, বিভাগ হয়ে অনুষ্ঠিত হয় চূড়ান্ত জাতীয় পর্ব। অংশগ্রহণকারী খুদে অ্যাথলেটদের জন্য জার্সি, প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সরঞ্জাম ও ভাতার সুব্যবস্থাও করা হয়েছিল। পুরো এই মহাযজ্ঞে সরকারের প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি, অ্যাথলেটিকস, দাবা, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট এই আটটি ডিসিপ্লিনের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে সম্ভাবনাময় মুখগুলো। সামনের দিনে এই ডিসিপ্লিনের সংখ্যা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
জাতীয় কাবাডি দলের কোচ ও এবারের নির্বাচক আব্দুল জলিল এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে জানান, এ ধরনের প্রতিভা অন্বেষণ আগে না হওয়ায় শুরুতে কিছুটা চ্যালেঞ্জ থাকলেও পরবর্তীতে সারাদেশ থেকে অসাধারণ সব প্রতিভা খুঁজে পাওয়া গেছে। সঠিক পরিচর্যা ও ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে এই খুদে খেলোয়াড়েরা খুব দ্রুতই জাতীয় দলের হয়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে বলে তিনি আশাবাদী।
এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর একটি হলো প্রান্তিক পর্যায় থেকে উঠে আসা সফল কিশোর-কিশোরীদের গল্প। যেমন—নাটোরের লালপুর উপজেলার নান্দ গ্রামের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস (ফারিহা মনি) মেয়েদের ফুটবলে দেশসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছেন। বাক্প্রতিবন্ধী বাবা ও দিনমজুর মায়ের সংগ্রামী সংসারের এই মেয়েটি তার আদর্শ জাতীয় ফুটবলার ঋতুপর্ণাকে অনুসরণ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সুনাম বয়ে আনতে চান। প্রধানমন্ত্রী ও ক্রীড়ামন্ত্রীর আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে ফারিহার মতো এমন হাজারো প্রতিভার চোখ এখন বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখছে।
খুদে এই ক্রীড়াবিদদের ধরে রাখতে এবং তাদের মেধার সঠিক বিকাশ ঘটাতে প্রতি বছর এই আয়োজন অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাছাইকৃতদের বিকেএসপিতে দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনের সুযোগ করে দিয়ে আগামী দিনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও এই বিষয়ে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে জানিয়েছেন যে, খেলাধুলার সাথে নিয়মিত যুক্ত থাকলে যুবসমাজ সহজেই মাদক, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসবাদের মতো সামাজিক অভিশাপ থেকে দূরে থাকে। একটি সুস্থ জাতি গঠন এবং বিশ্বমঞ্চে দেশের পরিচিতি বাড়াতে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস থেকে উঠে আসা সেরা প্রতিভাদের নিয়ে বছরব্যাপী অনুশীলন ও পড়ালেখার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর এই প্রথম সফল আয়োজন কেবল একটি সাধারণ প্রতিযোগিতা নয়; এটি তৃণমূলের অফুরন্ত সম্ভাবনাকে মূলধারায় নিয়ে আসার এক দারুণ সুযোগ। এই খুদে ক্রীড়াবিদদের নিয়মিত পরিচর্যা ও সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে আগামী দিনে তারাই হয়ে উঠবে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র।
মন্তব্য করুন