তীব্র আর্থিক সংকটে জর্জরিত শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর কাছে আরও একটি ব্যাংকের সম্পূর্ণ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে। ইতিপূর্বে এক্সিম ব্যাংক এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নতুন এই ব্যাংকের হাতে তুলে দেওয়ার ধারাবাহিকতায় এবার তৃতীয় ব্যাংক হিসেবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণও হস্তান্তর করা হলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে যে গত রোববার (৯ আগস্ট) একটি বিশেষ অফিসিয়াল চিঠির মাধ্যমে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে। এর আগে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক পূর্বে নিয়োগ করা প্রশাসককে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছিল এবং তাদের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ নতুন গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মূলত একীভূতকরণের তালিকায় থাকা পাঁচটি দুর্বল ব্যাংকের মধ্যে তিনটি ব্যাংক এখন আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর একক কাঠামোর অধীনে চলে আসল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে আরও জানা গেছে যে বাকি দুটি ব্যাংক থেকেও খুব দ্রুত পর্যায়ক্রমে প্রশাসক প্রত্যাহার করে নতুন এই ব্যাংকের কাছে তাদেরও নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করা হবে।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের তথ্য অনুযায়ী, বিগত সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের সময়ে এক্সিম ব্যাংক পরিচালিত হতো নজরুল ইসলাম মজুমদারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে, আর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ তালিকায় থাকা বাকি ব্যাংকগুলো ছিল বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলম সাহেবের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। দেশের ব্যাংকিং খাতে নেমে আসা চরম আর্থিক সংকট এবং সাধারণ আমানতকারীদের মনে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের আস্থার তীব্র সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করার মহৎ উদ্দেশ্যেই মূলত এই পাঁচটি ব্যাংককে একত্রিত করে মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকার বিশাল পরিশোধিত মূলধন নিয়ে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করা হয়েছে। নতুন এই ব্যাংকটির মূলধন কাঠামোতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি ২০ হাজার কোটি টাকা অনুদান বা মূলধন হিসেবে প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার ফান্ড সংগ্রহ করা হয়েছে ব্যাংকগুলোর সাধারণ আমানতকারীদের দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অর্থের বিপরীতে সেগুলোকে নিয়মমাফিক শেয়ারে রূপান্তর করার মাধ্যমে। যদিও ব্যাংকগুলোকে একটি একক প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার এই একীভূতকরণ প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে বেশ দূর এগিয়েছে, তবে এই পাঁচ ব্যাংকের জটিল প্রযুক্তিগত বা আইটি সমন্বয়ের কাজ এখনও পুরোপুরি সমাপ্ত হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে যতদিন পর্যন্ত সব ব্যাংকের আইটি ব্যবস্থা বা সফটওয়্যার একীভূত না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিভিন্ন বৈদেশিক বা নস্ট্রো হিসাবের সমস্ত লেনদেন আগের পুরোনো ব্যাংকগুলোর নিজ নিজ নামেই পরিচালিত হতে থাকবে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে প্রযুক্তিগত পূর্ণাঙ্গ একীকরণ প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলে এই পাঁচটি ব্যাংকের অতীতের পৃথক নিজস্ব পরিচিতি চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে সম্পূর্ণ একক নাম হিসেবে কেবল ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর ব্যানারে সব ধরনের আধুনিক ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
মন্তব্য করুন