গাজায় এক হাজার দিনেরও বেশি সময় ধরে চলমান বিধ্বংসী যুদ্ধ শুধু শহর, হাসপাতাল ও শরণার্থী শিবিরগুলোকে ধুলিস্বাৎ করেনি; এটি ফিলিস্তিনের গত তিন দশকের পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর গভীর সীমাবদ্ধতা ও অকার্যকারিতাকেও অত্যন্ত নির্মমভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৯৩ সালের বহুল আলোচিত অসলো চুক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের সঠিক প্রতিফলন ঘটাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে।
১৯৪৮ সালের ঐতিহাসিক নাকবার পর ফিলিস্তিনিরা বর্তমানে তাদের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম নিকষকালো ও কঠিন সময় পার করছে। কিন্তু এই ভয়াবহ সংকটের মুহূর্তেও তাদের প্রধান জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মকভাবে বিভক্ত, অকার্যকর এবং কাঠামোগত সংস্কারহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অসলো চুক্তি স্বাক্ষরের তিন দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন আজও অধরা রয়ে গেছে। এর পাশাপাশি, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি অবৈধ বসতিগুলোর সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে, পূর্ব জেরুজালেমে জোরপূর্বক সংযুক্তিকরণের প্রক্রিয়া আরও তীব্র করা হয়েছে এবং অবরুদ্ধ গাজা দীর্ঘদিন ধরে চরম যুদ্ধ ও অমানবিক অবরোধের মুখোমুখি হয়ে ধুঁকছে।
দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনি আইনসভা কার্যত সম্পূর্ণ অচল হয়ে রয়েছে এবং বছরের পর বছর ধরে দেশটিতে কোনো ধরনের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রশাসনিক দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং অর্থবহ সংস্কারের চরম অভাব নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এর ফলস্বরূপ, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মূলধারার প্রতিষ্ঠানগুলোর জনসমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠেছে।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মতে, এই কাঠামোগত সংকটটি কেবল প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের একক নেতৃত্বের ব্যর্থতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে সবচেয়ে বড় এবং মৌলিক প্রশ্ন হলো ভবিষ্যতে সমগ্র ফিলিস্তিনি জাতীয় আন্দোলনের সামগ্রিক নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্ব কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে। ২০০৬ সালের সর্বশেষ অনুষ্ঠিত আইনসভা নির্বাচনে হামাস গণতান্ত্রিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে কোনো নির্বাচন না হওয়ায় সেই জনসমর্থনের নতুন কোনো পরীক্ষা বা যাচাই হয়নি। তা সত্ত্বেও গাজার অভ্যন্তরীণ প্রশাসন পরিচালনা, ইসরাইলের সঙ্গে জটিল যুদ্ধবিরতি আলোচনা, বন্দি বিনিময় চুক্তি এবং সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকার কারণে হামাস এখনো ফিলিস্তিনি রাজনীতির অন্যতম প্রধান ও প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
একইভাবে, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ সরাসরি নির্বাচনি রাজনীতির প্রক্রিয়ায় অংশ না নিলেও পশ্চিম তীরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রভাব যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল ফাতাহ আন্দোলনও বর্তমানে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল, বিভক্তি এবং চরম নেতৃত্ব সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়ে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, কেবল দায়সারা গোছের একটি নির্বাচন আয়োজন করলেই ফিলিস্তিনের বর্তমান সংকটের কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে না। বরং ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা বা পিএলও-এর আমূল ও ব্যাপক সংস্কার সাধন, হামাস ও ইসলামিক জিহাদের মতো প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে বৃহত্তর জাতীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ফিলিস্তিনি প্রবাসীদের নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত করাই হতে পারে ভবিষ্যতের একমাত্র সঠিক পথ।
তাদের মতে, গাজার এই ধ্বংসস্তূপ ও রক্তপাত থেকে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে এসেছে, তা হলো গাজা, পশ্চিম তীর, জেরুজালেম, শরণার্থী শিবির এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী ফিলিস্তিনিদের একত্র করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কীভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। এই মৌলিক প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তরই আগামী দিনে ফিলিস্তিনের জাতীয় আন্দোলন এবং তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সঠিক গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।
মন্তব্য করুন