জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর কেটে রাখা অগ্রিম করের টাকা আর ফেরত পাওয়া যাবে না। এমনকি যাদের করযোগ্য আয় নেই, তাদেরও এখন এই অগ্রিম করের টাকা ফেরত পেতে হলে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নিতে হবে এবং রিটার্ন জমা দিতে হবে। পাশাপাশি, শহর এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাট বণ্টন বা মিউটেশন (নামজারি) করার ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্নের প্রমাণপত্র দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কর্তৃক ঘোষিত নতুন অর্থবছরের বাজেটে এই পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে, যা করদাতাদের জন্য একদিকে যেমন কিছু সুবিধা তৈরি করেছে, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত ও বড় করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপও সৃষ্টি করতে পারে।
শহুর এলাকায় ফ্ল্যাট ও জমির মালিকানা নিশ্চিত করতে এনবিআর কঠোর শর্ত আরোপ করেছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ক্যানটনমেন্ট বোর্ড এলাকার জমি এবং ফ্ল্যাটের বণ্টন ও মিউটেশন (নামজারি) করতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র (পিএসআর) দেখাতে হবে। রিটার্নের প্রমাণপত্র ছাড়া কোনোভাবেই জমি বা ফ্ল্যাটের নামজারি করা যাবে না। বর্তমানে জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি, লিজ, হস্তান্তর, বায়নানামা কিংবা আমমোক্তারনামা নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও এই রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র প্রয়োজন হয়। এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, শহর এলাকায় জমি ও ফ্ল্যাটের প্রকৃত বাজারমূল্য অনেক বেশি হওয়ায় ধরে নেওয়া যায় যে ক্রেতাদের করযোগ্য আয় রয়েছে, যা করমুক্ত আয়সীমার নিচে থাকা মানুষের পক্ষে কেনা অসম্ভব।
নতুন বাজেটের অর্থবিলের মাধ্যমে রিটার্ন জমার বাধ্যবাধকতার পরিধি আরও বাড়ানো হয়েছে। এখন থেকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হতে হলে বার্ষিক আয়কর রিটার্ন দেওয়ার প্রমাণপত্র (পিএসআর) দেখানো বাধ্যতামূলক। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে এই রিটার্ন জমার রসিদ সংযুক্ত করতে হবে। নিবাসী করদাতা কোম্পানির পরিচালক বা স্পনসর শেয়ারহোল্ডার হতে হলেও রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র লাগবে, তবে অনিবাসী পরিচালক ও স্পনসর শেয়ারহোল্ডারদের জন্য এই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। বর্তমানে ব্যাংক ঋণ, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, পেশাজীবী সংস্থাসমূহের (আইনজীবী, चिकित्सक, প্রকৌশলী ইত্যাদি) সদস্যপদ নবায়ন এবং আবাসিক গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগসহ মোট ৩৯ ধরনের সেবায় রিটার্নের প্রমাণপত্র আবশ্যক।
নতুন প্রস্তাব অনুসারে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে যে উৎসে কর কেটে রাখা হয়, তা আর চূড়ান্ত কর দায় নয়; বরং বছর শেষে তা সমন্বয় করা যাবে। যদি করদাতার প্রযোজ্য করের চেয়ে বেশি টাকা কেটে রাখা হয়, তবে তিনি তা ফেরত পাবেন।
উদাহরণস্বরূপ, কারো সঞ্চয়পত্রের মুনাফা থেকে বছরে ৩০ হাজার টাকা অগ্রিম কর কাটা হলো, কিন্তু রিটার্ন জমার পর দেখা গেল তাঁর প্রকৃত কর ২০ হাজার টাকা; তবে তিনি বাকি ১০ হাজার টাকা ফেরত পাবেন। এই টাকা ফেরত পেতে রিটার্ন জমার সময় ব্যাংক হিসাব নম্বর জানাতে হবে এবং কর কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই করে ১২০ দিনের মধ্যে টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ফেরত দেবেন। বর্তমানে ৫ লাখ টাকার কম বিনিয়োগকারী প্রায় ১৪ লাখ মধ্যবিত্ত গ্রাহক রয়েছেন, যারা টিআইএন ছাড়াই বিনিয়োগ করেছিলেন। এখন তাদের কেটে রাখা ৫ শতাংশ বা ১০ শতাংশ অগ্রিম কর ফেরত পেতে হলে বাধ্যতামূলকভাবে টিআইএন নিয়ে আয়কর রিটার্ন দিতে হবে।
এবারের বাজেটে বড় করদাতাদের জন্য বিনিয়োগজনিত কর রেয়াতের সুবিধা কিছুটা কমিয়ে আনা হয়েছে। অর্থবিলের মাধ্যমে আয়কর আইনের ৭৮ ধারায় সংশোধন এনে সর্বোচ্চ কর রেয়াতের পরিমাণ ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা করা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, মোট করযোগ্য আয়ের ৩ শতাংশ, মোট বিনিয়োগের ১০ শতাংশ কিংবা সর্বোচ্চ সাড়ে ৭ লাখ টাকা—এই তিনটির মধ্যে যেটি কম হবে, সেটাই রেয়াতের পরিমাণ হিসেবে গণ্য হবে। এর ফলে বছরে ৩ কোটি টাকা আয় করা কোনো করদাতা ১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেও আগের চেয়ে আড়াই লাখ টাকা কম কর রেয়াত পাবেন।
তবে সাধারণ করদাতাদের জন্য সুখবর হলো, আগামী অর্থবছর থেকে সারা বছরই আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে। এমনকি নির্ধারিত সময়ের আগে রিটার্ন জমা দিলে বিশেষ করছাড়ের সুবিধাও মিলবে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে (প্রথম প্রান্তিক) রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ২৫ হাজার টাকা (যেটি কম) ছাড় পাওয়া যাবে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে (দ্বিতীয় প্রান্তিক) রিটার্ন দিলে সাধারণ নিয়মেই কর পরিশোধ করতে হবে, কোনো বাড়তি প্রণোদনা মিলবে না। আবার জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে (তৃতীয় প্রান্তিক) রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকা (যেটি বেশি) অতিরিক্ত প্রদান করতে হবে। আর এপ্রিল থেকে জুন মাসের মধ্যে (চতুর্থ প্রান্তিক) রিটার্ন জমা দিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকা (যেটি বেশি) অতিরিক্ত বা জরিমানা হিসেবে দিতে হবে।
মন্তব্য করুন