টানা দুই আসরের চরম ব্যর্থতা কাটিয়ে আবারও বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। আর জার্মানদের এই দারুণ সাফল্যের নেপথ্যে নায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন এমন একজন ফুটবলার, যাঁর অতীত জীবন ছিল আর দশটা সাধারণ মানুষের মতোই কঠিন। তিনি ডেনিজ উন্দাভ, যিনি একসময় নিজের জীবিকা নির্বাহের জন্য দিনে দীর্ঘ ৮ ঘণ্টা কারখানায় কঠোর পরিশ্রম করতেন এবং ফুসরত মিললেই ফুটবল খেলতেন। আইভরি কোস্টের বিরুদ্ধে ২-১ গোলের মহাগুরুত্বপূর্ণ জয়ে জোড়া গোল করে তিনি রাতারাতি পুরো জার্মানির নয়নের মণি ও জাতীয় নায়ক বনে গেছেন।
কয়েক মাস আগেও ডেনিজ উন্দাভের বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছিল এক বিশাল অনিশ্চয়তা। এমনকি দলের প্রধান কোচ জুলিয়ান নাগেলসমানের সঙ্গেও এক পর্যায়ে তাঁর মৃদু বচসা ও বিতর্ক তৈরি হয়। উন্দাভ এক ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে শেষ সময়ে গোল করার পর মন্তব্য করেছিলেন যে তিনি দলের শুরুর একাদশে (স্টার্টিং ইলেভেন) খেলার যোগ্যতা রাখেন। তবে জার্মান কোচ তখন সংবাদমাধ্যমের সামনে উল্টো জবাব দিয়ে বসেন যে উন্দাভ যদি ম্যাচ শুরু থেকে খেলতেন, তাহলে হয়তো ওই গোলটিই করতে পারতেন না। সেই মনস্তাত্ত্বিক বিতর্কের মোক্ষম জবাব উন্দাভ দিয়েছেন মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে তাঁর দুর্দান্ত জয়ের পর কোচ নাগেলসমানও নিজের ভুল স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি এখন উন্দাভকে শুরুর একাদশে রাখার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন এবং তাঁর অসাধারণ ছন্দের প্রশংসা করছেন।
ডেনিজ উন্দাভের ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্পটা যেকোনো সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। মাত্র ১৪ বছর বয়সে বিখ্যাত ক্লাব ভের্ডার ব্রেমেন তাঁকে এই বলে দল থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল যে, ছোটখাটো শারীরিক গড়নের কারণে ফুটবলে তাঁর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। এই নির্মম প্রত্যাখ্যান কিশোর উন্দাভকে মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে দিয়েছিল। তবে দমে না গিয়ে নতুন উদ্যমে নিজেকে গড়ে তোলেন এবং ১৭ বছর বয়সে পরিবার ছেড়ে জার্মানির চতুর্থ বিভাগের ক্লাব হাভেলসেতে যোগ দেন। সেখানে সপ্তাহে তিনি পেতেন মাত্র ১২০ পাউন্ড, যা দিয়ে জীবন চালানো অসম্ভব ছিল। ফলে ফুটবল খেলার পাশাপাশি বেঁচে থাকার তাগিদে তাঁকে কারখানায় শ্রমিকের কাজ করতে হতো।
উন্দাভ বেলজিয়ান গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেই কঠিন দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানান যে, তিনি প্রতিদিন ভোর ৪টার দিকে ঘুম থেকে উঠতেন। এরপর কারখানায় ৮ ঘণ্টার শিফট শেষ করে সরাসরি চলে যেতেন ফুটবল অনুশীলনে। সব শেষ করে রাত ৮টার দিকে বাড়ি ফিরতেন এবং পরদিন আবার একই রুটিনে জীবন চলত। ২০২০ সালে বেলজিয়ামের ক্লাব ইউনিয়ন সেন্ট-জিলোয়াজে যোগ দেওয়ার পর উন্দাভের ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে এবং তিনি আজ জার্মানির হয়ে বিশ্বমঞ্চে বড় স্বপ্ন দেখছেন।
মন্তব্য করুন