ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিয়ে নানা মহলে গুঞ্জন ও আলোচনা থাকলেও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করছেন জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে প্রথমেই জটিল বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। এছাড়া আওয়ামী লীগের জন্যও তাদের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের অতীত শাসনামল নিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার মাত্র ৪ মাস পার হয়েছে। এই অল্প সময়ে সরকারের বড় কোনো ভুল-ভ্রান্তি যেমন জনমনে স্পষ্ট হয়নি, তেমনি হাসিনাবিরোধী তথা গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলো এখনো তাঁর প্রশ্নে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধ আছে। ফলে দেশীয় জনমত বা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সমর্থন কোনো পরিস্থিতিই এখন পর্যন্ত হাসিনা বা আওয়ামী লীগের পক্ষে নেই।
শেখ হাসিনার দেশে ফিরে রাজনীতি করার প্রসঙ্গ নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ তাঁদের সুনির্দিষ্ট মতামত তুলে ধরেছেন:
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম (সাবেক সভাপতি, সিপিবি): তিনি মনে করেন, এই মুহূর্তে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়। বরং বিগত শাসনামলে দেশে যে অপরাধ, দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের অভিযোগ সামনে এসেছে, সেগুলোর বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তিনি যত বড় নেতাই হোন না কেন, তাঁকে আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।
মাহমুদুর রহমান মান্না (সভাপতি, নাগরিক ঐক্য): তাঁর মতে, শেখ হাসিনার রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার আলোচনাটি মূলত দেশের বাইরে, বিশেষ করে সীমান্তের ওপারের কিছু মহল, মিডিয়া এবং আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী নেতাকর্মীদের মধ্যেই বেশি সীমাবদ্ধ। গণ-অভ্যুত্থানের পর দলটির মধ্যে কোনো ধরনের আত্মসমালোচনা বা অনুতাপের প্রবণতা দেখা যায়নি, যা তাদের জনগণ থেকে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে। তবে আওয়ামী লীগের মতো বড় শক্তির ভবিষ্যৎ পুরোপুরি শেষ ভাবার কারণ নেই; যদি তারা অতীতের ভুল উপলব্ধি করে পরিশীলিত কর্মসূচির মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে।
রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) রুকন উদ্দিনের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরাটা কোনো রাজনৈতিক পুনর্বাসনের বিষয় নয়, বরং এটি পুরোপুরি জবাবদিহি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত গুরুতর অভিযোগগুলোর আইনি নিষ্পত্তির জন্য সরকারও কূটনৈতিকভাবে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরেই রাষ্ট্র ও জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে তারা ভবিষ্যতে রাজনীতি করতে পারবে কিনা। তবে জুলাই আন্দোলনের তরুণ প্রজন্ম এখনো সংগঠিত এবং দেশজুড়ে তীব্র আওয়ামীবিরোধী জনমত বিদ্যমান থাকায় এখনই পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ নেই।
রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, দেশে বর্তমানে কোনো রাজনৈতিক শূন্যতা নেই। শুধু নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা করে রাখলেই আওয়ামী লীগের মতো পুরোনো দল চিরতরে হারিয়ে যাবে না, তারা ফিরে আসার চেষ্টা করবেই। তবে দল হিসেবে তাদের মূল বাধা হলো বিগত সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলের ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি করা। অন্য এক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্লেষক সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, প্রকাশ্যে রাজনীতি করার পরিস্থিতি না থাকলেও আওয়ামী লীগ দেশি-বিদেশি মহলের সহযোগিতায় দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে, যা সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।
মন্তব্য করুন