ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এই ধরনের তৎপরতা বাংলাদেশের অখণ্ড সার্বভৌমত্ব, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং এ দেশের আপামর জনগণের গণতান্ত্রিক রায়ের প্রতি একটি স্পষ্ট ও সরাসরি অবমাননা। সোমবার দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় দেওয়া এক জোরালো পোস্টে তিনি এই মন্তব্য করেন।
নাহিদ ইসলামের ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরে বলা যায়, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের আইনি ও রাজনৈতিক প্রশ্নের যৌক্তিক সমাধান না করে ভারতের সঙ্গে কোনো ধরনের স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এ দেশের সাধারণ মানুষের নিকট কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। বিগত দুই বছর ধরে ভারত তার নিজেদের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করে দণ্ডিত অপরাধী ও খুনি শেখ হাসিনাকে নিয়মিতভাবে বাংলাদেশবিরোধী নানা কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দিয়ে আসছে, যা দুই দেশের বন্ধুত্বের অন্তরায়। বিশেষ করে সম্প্রতি বাংলাদেশের স্পষ্ট আপত্তি ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে দিল্লিতে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর কথিত সংবাদ সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হয়েছে যে, বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দীর্ঘদিনের আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসী নীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কেবল একটি গতানুগতিক বিবৃতি দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের ওপর এই ধরনের গুরুতর ও নগ্ন আঘাতের পরও বর্তমান সরকার ভারতের নীতিনির্ধারক মহলের কাছ থেকে এখনো পর্যন্ত কোনো কার্যকর জবাবদিহিতা আদায় করতে পারেনি। পরিস্থিতি আরও বেশি উদ্বেগজনক এই কারণে যে, সম্প্রতি বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের সঙ্গে ভারতীয় হাইকমিশনারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও ৫ আগস্টের ওই ঘটনার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা কিংবা ভারতের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশের বিষয়টি জনসমক্ষে আসেনি। দেশের জনগণের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি এতবড় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যথাযথ গুরুত্ব না পাওয়ায় তিনি গভীর হতাশা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে ভারতীয় হাইকমিশনারের দেওয়া ‘শেয়ার্ড ড্রিম’ বা অংশীদারিত্বের স্বপ্নের ধারণার তীব্র সমালোচনা করে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, বাংলাদেশের জনগণ কোনো অবস্থাতেই এমন কোনো কথিত সম্প্রসারণবাদী স্বপ্নের অংশীদার হতে পারে না। বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষ কখনোই এমন কোনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মেনে নেবে না যেখানে দিল্লি নিজ থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ছক কষার বা অযাচিত প্রভাব বিস্তারের অধিকার দাবি করে। বাংলাদেশ সর্বদা একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া দেখতে চায়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেওয়া আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্রকে দ্রুত একটি কার্যকর ও দৃশ্যমান কূটনৈতিক পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে নাহিদ বলেন, ৫ আগস্টের ন্যাক্কারজনক ঘটনার বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও নিঃশর্ত দুঃখ প্রকাশ, দণ্ডিত শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য খুনিদের দ্রুত প্রত্যর্পণ এবং ভারতের ভূখণ্ড থেকে সব ধরনের বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতা স্থায়ীভাবে বন্ধের নিশ্চয়তা এই মৌলিক প্রশ্নগুলোতে বর্তমান সরকারের অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন।
ভারতের ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ যদি এভাবেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ পেতেই থাকে, তবে একই সময়ে বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধানের ভারত সফর করে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যেকোনো উদ্যোগ সম্পূর্ণ অর্থহীন বলে অভিহিত করেন তিনি। বন্ধুত্বের দুর্বল অজুহাতে বাংলাদেশের পবিত্র সার্বভৌমত্ব, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং এ দেশের জনগণের দীর্ঘ সংগ্রামের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে কোনোভাবেই অবমূল্যায়ন বা উপেক্ষা করা চলবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন নাহিদ ইসলাম।
মন্তব্য করুন