প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রস্তাবিত ভারত সফর নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা জল্পনা-কল্পনা। গত আগস্ট মাসের দ্বিতীয়ার্থে তার দিল্লি যাওয়ার পরিকল্পনা অন্তত দু’দুবার শেষ মুহূর্তে এসে বাতিল হয়েছে। অথচ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা স্বয়ং এই আমন্ত্রণপত্র তারেক রহমানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশনেও বিমস্টেক জোটের চেয়ার হিসেবে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এতসব আমন্ত্রণ সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির অভ্যর্থনার মহড়া পর্যন্ত বাতিল হওয়ার পেছনে মূলত কাজ করছে এক জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।
এই সফর বারবার পেছানোর প্রধান এবং সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে আসছে ভারতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতি। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ বা দেশের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি পূরণ না হলে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে দিল্লির আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো, প্রত্যর্পণের অনুরোধ বিবেচনাধীন থাকলেও শেখ হাসিনা বর্তমানে ব্যক্তিগত ক্যাপাসিটিতে বক্তব্য রাখছেন এবং এর সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে বিশ্লেষকদের মতে, দুইপক্ষ একে অপরের সম্পূর্ণ কথা বিশ্বাস করছে না। ঢাকার ধারণা, ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছাড়া শেখ হাসিনার পক্ষে অনলাইনে সংবাদ সম্মেলন করা সম্ভব ছিল না; আর দিল্লির বিশ্বাস, বাংলাদেশ সরকারও আসলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা এড়াতে তাকে এই মুহূর্তে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে পুরোপুরি প্রস্তুত নয়।
এই কূটনৈতিক বরফ গলাতে ভারত চাইছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রিজমের বাইরে গিয়ে ঢাকা ও দিল্লি পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিক। সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাত করে ঠিক এই বার্তাই দিয়েছেন। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, দেশের একটি বিরাট অংশ যাকে স্বৈরাচার হিসেবে দেখে, সেই ব্যক্তির আশ্রয়দাতা দেশটিতে প্রধানমন্ত্রী সফর করলে তা দেশের মানুষ ভালোভাবে নেবে না। সাউথ ব্লকের কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার নিজ থেকেই দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কোনো সমঝোতা হলে এই সফর সংক্রান্ত প্রধান বাধাটি কেটে যেতে পারে।
সবকিছু ছাপিয়ে এটা স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে ঝুলে থাকা বিভিন্ন প্রকল্প, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন এবং তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর ভারত প্রবলভাবেই চায় তিনি যত দ্রুত সম্ভব দিল্লি সফরে আসুন। দ্বিপাক্ষিক সফর এই মুহূর্তে পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও, ব্রিকস সম্মেলনের বহুপাক্ষিক ফোরাম তারেক রহমানের ভারতে আসার একটি বড় সুযোগ করে দিতে পারে। বহুপাক্ষিক এই আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোর বাধ্যবাধকতা অনেক সময় বৈরী সম্পর্ককেও একই টেবিলে বসতে বাধ্য করে। ফলস্বরূপ, ব্রিকস সম্মেলনের সাইডলাইনে নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনাও প্রবল। সব মিলিয়ে দিল্লি এখন মনে করছে যে, সফর বাস্তবায়নের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাদের সিদ্ধান্তের ওপর।
মন্তব্য করুন