বারাক ওবামার চুক্তিটি ছিল ১৬০ পৃষ্ঠারও বেশি দীর্ঘ একটি চূড়ান্ত এবং বিস্তারিত দলিল, যা ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন’ (JCPOA) নামে পরিচিত। ওবামার এই চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ছিল, যা ২০১৮ সালে ট্রাম্প ‘ভয়াবহ’ আখ্যা দিয়ে বাতিল করেন। বিপরীতে, ট্রাম্পের বর্তমান ‘সমধ্যোতা স্মারক’ কোনো চূড়ান্ত চুক্তি নয়; এটি মাত্র দেড় পৃষ্ঠার একটি ১৪-দফা রূপরেখা, যা কয়েক সপ্তাহের আলোচনার পর তৈরি হয়েছে। ওবামার আলোচনাটি ছিল বহুপাক্ষিক, যেখানে তিনি প্রায় দুই বছর ধরে চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, ব্রিটেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। তবে ট্রাম্প হেঁটেছেন সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক পথে, যেখানে আলোচনা কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ট্রাম্পের বর্তমান রূপরেখাটি একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি বাস্তবায়নে ৬০ দিনের একটি আলোচনার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে, যেখানে পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা ও হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো অনেক জটিলতা রয়ে গেছে।
উভয় চুক্তিতেই ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিলেও তা নিয়ন্ত্রণের কৌশলে বড় ভিন্নতা রয়েছে। ওবামার চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) দ্বারা কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা ছিল। এমনকি ট্রাম্পের চুক্তি বাতিলের আগে পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাও ইরানের চুক্তি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিল। অন্যদিকে, ট্রাম্পের বর্তমান সমঝোতা স্মারকে ভবিষ্যতে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট পরিদর্শনের উল্লেখ নেই। এটি কেবল পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের একটি সাধারণ পথ দেখায়, তবে ৬০ দিনের আলোচনার বাইরে ইরানের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি এতে নেই। যদিও ইরান তাদের উচ্চ-মাত্রার ইউরেনিয়ামের মজুদ আইএইএ-এর তত্ত্বাবধানে ধ্বংস করার ইঙ্গিত দিয়েছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি পরবর্তী আলোচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অবরুদ্ধ অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রেও দুই রাষ্ট্রপ্রধান সম্পূর্ণ বিপরীত পথ অবলম্বন করেছেন। ওবামা প্রশাসন সুনির্দিষ্ট শর্ত এবং ইরানের প্রতিটি পদক্ষেপ কঠোরভাবে যাচাই করার পর ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিল। কিন্তু ট্রাম্পের বর্তমান সমঝোতা স্মারকে শুরুতেই ইরানকে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ইরান অবিলম্বে তেল রপ্তানির সুযোগ পাচ্ছে এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ফ্রিজ করা অর্থ ফেরত পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। তাছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের কথা বলেছে, যার শর্তাবলি এখনো ধোঁয়াশায় ঘেরা। অতীতে ওবামা প্রশাসন ১৯৮১ সাল থেকে আটকে থাকা ১.৭ বিলিয়ন ডলার ইরানি তহবিল ফেরত দেওয়ায় ট্রাম্প তীব্র সমালোচনা করলেও, এখন তিনি নিজে ইরানকে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করায় তাঁর নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থীদের মধ্যেও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
মন্তব্য করুন