ভোলার তজুমদ্দিনে নামের মিল থাকায় এক মৃত শিক্ষকের ব্যাংক হিসাব ও ইনডেক্স নম্বর জালিয়াতি করে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে সরকারি বেতন-ভাতা তোলার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত ওই নেতার নাম মো. মহিউদ্দিন, যিনি তজুমদ্দিন উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমেই তিনি প্রতিষ্ঠানটিতে অবৈধভাবে নিয়োগ পেয়েছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর প্রতিকার চেয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন মোহাম্মদ ভেলা ওমরিয়া ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. নুরুজ্জামান। সুপার মো. নুরুজ্জামানের দাখিল করা লিখিত অভিযোগের বিবরণী থেকে জানা যায়, তজুমদ্দিনের ওই মাদ্রাসায় ১৯৯৪ সালের ১৩ মার্চ অন্য এক ব্যক্তি মো. মহিউদ্দিন জুনিয়র শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন, যার ইনডেক্স নম্বর ছিল ৩৬৪৭৭৬ এবং ব্যাংক হিসাব নম্বর ৪৬০৬। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে ওই শিক্ষকের মৃত্যুর পর মাদ্রাসায় পদটি শূন্য হয়। এরপর তজুমদ্দিন ডিগ্রি কলেজের অফিস সহকারী ও জামায়াত নেতা মো. মহিউদ্দিন (পিতা: আছমত আলী মহাজন), যার নিজস্ব ইনডেক্স নম্বর ৬০২৭৮২ এবং ব্যাংক হিসাব নম্বর ৪৫৭৭; তিনি ২০০৬ সালের ৭ অক্টোবর সম্পূর্ণ বিধিবহির্ভূতভাবে ওই মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০০৫ সালে শিক্ষক নিবন্ধন চালুর পর তথ্য গোপন করে ২০০৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্বের মৃত শিক্ষকের ইনডেক্স ও নামের মিলকে কাজে লাগিয়ে ব্যাংক হিসাব নম্বর ব্যবহার করে আসছিলেন অভিযুক্ত মহিউদ্দিন। এর মাধ্যমে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি কোষাগার থেকে অবৈধভাবে অর্থ উত্তোলন করে আর্থিক সুবিধা নিয়ে আসছেন। শুধু তাই নয়, তিনি সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পেলেও বেতন ভোগ করছিলেন জুনিয়র শিক্ষক পদের অনুকূলে। বিশেষ করে ২০০৭ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের এমপিও শিট পর্যালোচনায় মহিউদ্দিনের ইনডেক্সের বিপরীতে মৃত শিক্ষকের ৪৬০৬ নম্বর ব্যাংক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। এই জালিয়াতির ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কঠোর বিধি মোতাবেক প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন মাদ্রাসা সুপার।
এদিকে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত সহকারী শিক্ষক মো. মহিউদ্দিন দাবি করেছেন, সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তার ভাষ্যমতে, হিসাব নম্বর এক হলেও তিনি ওই অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো অবৈধ বেতন তোলেননি এবং নিয়োগের সময়ও কোনো তথ্য গোপন করেননি। তিনি উল্টো অভিযোগ করে বলেন, এই সমস্যার সমাধান করার কথা বলে মাদ্রাসা সুপার মোহাম্মদ নুরুজ্জামান তার কাছে ২০১৮ সালে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন এবং তিনি দফায় দফায় ৩ লাখ টাকা দেওয়ার পরও সুপার কোনো সুরাহা করেননি। পরবর্তীতে সেই ৩ লাখ টাকা ফেরত চাওয়ার কারণেই সুপার তার বিরুদ্ধে শত্রুতা শুরু করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
অপরদিকে মাদ্রাসার সুপার মোহাম্মদ নুরুজ্জামান মহিউদ্দিনের কাছ থেকে ৩ লাখ টাকা নেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, বর্তমানে মাদ্রাসার শিক্ষক এমপিও শিটে ৬০২৭৮২ ইনডেক্সের বিপরীতে ৪৬০৬ নম্বর অ্যাকাউন্টে সহকারী শিক্ষক মহিউদ্দিনের নাম রয়েছে। তিনি সুপারের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টি অবগত হলেও বিভিন্ন জটিলতার কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে।
ঘটনাটি নিয়ে তজুমদ্দিন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হবে এবং তদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দপ্তরে পাঠানো হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভোলা জেলা শাখার সেক্রেটারি কাজী মাওলানা হারুনুর রশিদ বলেছেন, সুনির্দিষ্ট এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে জেলা জামায়াতের পক্ষ থেকে তজুমদ্দিন উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারির বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্ত পরিচালনা করতে একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন যে এই পুরো জালিয়াতি ঘটনায় মাদ্রাসা সুপার নিজেও সরাসরি জড়িত রয়েছেন এবং তিনি সুপারের বিরুদ্ধেও প্রশাসনের মাধ্যমে সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন।
মন্তব্য করুন