প্রবাসে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে ৯ মাসে দেশে ফিরেছেন ১৬৮৭ নারী কর্মী, যার ৫৮.৬২ শতাংশই সৌদি ফেরত। নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।
বৈদেশিক মুদ্রার চাকা সচল রাখতে ও পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্নে প্রতি বছর হাজার হাজার নারী কর্মী মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। কিন্তু প্রবাসে গিয়ে তীব্র নির্যাতন, মানসিক নিপীড়ন এবং বৈষম্যের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন তাদের একটি বড় অংশ। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের আউটপাস রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরের গত ৯ মাসে প্রবাসে নানা অন্যায়ের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মী। উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ফেরত আসা এই নারীদের অর্ধেকেরও বেশি,অর্থাৎ ৯৭৯ জনই একা সৌদি আরব থেকে ফিরেছেন।
হিসাব অনুযায়ী, দেশে ফিরে আসা মোট নারী কর্মীদের ৫৮.৬২ শতাংশই সৌদি আরব ফেরত। এছাড়া অন্যান্য দেশের মধ্যে জর্ডান থেকে ২২৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৮ জন, ভারত থেকে ৫২ জন এবং মালয়েশিয়া থেকে ৪৮ জন নারী কর্মী গত ৯ মাসে দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ১২৮ জন, ফেব্রুয়ারি ৯৭, মার্চ ৩০, এপ্রিলে ২৩৬, মে ১৬৭, জুনে ১৬৯, জুলাইয়ে ৩৩১, আগস্টে ৩০৯ এবং সেপ্টেম্বরে ২২০ জন নারী কর্মী দেশে ফিরেছেন। কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই সৌদি আরব থেকে ১০৩ জন এবং জর্ডান থেকে ৬৪ জন নারী কর্মী দেশে ফেরেন।
সৌদি আরব থেকে ফিরে আসা সাভারের গৃহকর্মী শিলা বেগম নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে জানান, পরিবারকে সহযোগিতা করতে ২০২৫ সালের মাঝামাঝিতে তিনি সৌদি আরব গিয়েছিলেন। কিন্তু এক বছর না পেরোতেই চলতি বছরের এপ্রিলে দেশে ফিরতে বাধ্য হন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, সেখানে ২৪ ঘণ্টা একটানা কাজ করানো হতো, ঠিকমতো খাবার দেওয়া হতো না এবং ঘুমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল রান্নাঘরে। বাসা থেকে বের হতে দেওয়া হতো না এবং জেলখানার মতো বন্দি জীবন কাটাতে হতো। সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত দেশ থেকে টাকা আনিয়ে তিনি দেশে ফেরেন।
একইভাবে নিজের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন ভেঙে ফিরে আসা দোহারের জাহানারা বেগম জানান, স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর ভাইদের ওপর বোঝা না হয়ে নিজের সব সঞ্চয় বিক্রি ও ধারদেনা করে সৌদি পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে মালিকের চরিত্রহীন আচরণ, কুপ্রস্তাব এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। রাজি না হওয়ায় তাঁর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো, যার কারণে বাধ্য হয়ে খালি হাতে দেশে ফিরতে হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রবাসে গিয়ে আকঙ্ক্ষিত কাজ না পাওয়া, নিয়মিত বেতন না দেওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থতা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, স্বাস্থ্যগত জটিলতা এবং সামাজিক ও ভাষাগত প্রতিবন্ধকতার কারণেই মূলত নারীরা ফিরে আসছেন। অনেক ক্ষেত্রে নারী গৃহকর্মীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় দেশে ফিরছেন। এর চেয়েও করুণ বাস্তবতা হলো, অনেকের স্বপ্ন কফিনবন্দী হয়ে দেশে ফিরে আসে, যেখানে মৃত্যুসনদে অতি সাধারণভাবে 'স্বাভাবিক মৃত্যু' কিংবা 'আত্মহত্যা' লিখে দেওয়া হয়।
অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর একটি গবেষণায় উঠে এসেছে যে, দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হওয়া নারী কর্মীদের ৯৪ শতাংশই প্রবাসে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। এর পাশাপাশি ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং ৮২ শতাংশ কর্মীকে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিরতিহীন কাজ করতে হয়েছে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় বাংলাদেশ সরকারকে আগে থেকে কিছু না জানিয়ে নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সিতি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনায় কূটনৈতিক তদারকি ও প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ভিয়েনা প্রটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগে ঢাকা অবস্থানরত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে পাঠায় সরকার এবং জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেটের মাধ্যমেও আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন, যার দুই-তৃতীয়াংশই (৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন) গেছেন সৌদি আরবে। চলতি বছরেও বহির্গমন ছাড়পত্র নেওয়া ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জনের মধ্যে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৪৩ জনই গেছেন সৌদি আরবে। অর্থাৎ বাজার সম্প্রসারণের আলোচনা হলেও প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো অনেকটাই একক দেশ বা সৌদি নির্ভর রয়ে গেছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভিবাসন ও শরণার্থী-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর জানান, বাংলাদেশকে অতি দ্রুত একক গৃহকর্মী নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প এবং টেকনিক্যাল খাতে নজর দিতে হবে। জর্ডানের মতো তৈরি পোশাক খাত বা অন্যান্য শিল্প ক্ষেত্রে নারীদের প্রশিক্ষিত করে পাঠালে নিরাপত্তার ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসে। এছাড়া রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর তদারকি বাড়িয়ে গৃহকর্মীদের ব্যক্তিগত বাসার পরিবর্তে ডরমিটরি বা হোস্টেলভিত্তিক বাসস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করার ওপর জোর দেন তিনি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে নারীদের সহায়তায় বর্তমানে ১৩টি দেশে আইনি সহায়তা কেন্দ্র এবং সৌদিতে সেফ হোম চালু রাখা হয়েছে। তবে শুধু সচেতনতা বৃদ্ধিই নয়, বরং গ্রাম থেকে যাওয়া নারী কর্মীদের আন্তর্জাতিক চুক্তি, কাজের সময় এবং সুরক্ষার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ দিয়ে নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
মন্তব্য করুন