জয়পুরহাটের মাদারগঞ্জ দুর্গা মন্দিরে দেব-দেবীর পাশাপাশি দেওয়ালে শান্তি, প্রকৃতি সংরক্ষণ ও মানবিকতার বার্তা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বিস্তারিত জানুন।
শারদীয় দুর্গাপূজা মানেই আবহমান বাংলার চিরন্তন আনন্দ, বর্ণিল আলোকসজ্জা আর সম্প্রীতির আবহ। মণ্ডপে মণ্ডপে ভক্তদের ভক্তিঘন সমাগম ও ধূপ-কাঁসরের ধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত থাকলেও, উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা জয়পুরহাটের মাদারগঞ্জ দুর্গা মন্দির এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনিন্দ্য রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে। কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, এই মন্দিরটি দর্শনার্থীদের জন্য এক মানবিক ও আত্মশুদ্ধির শিক্ষা নিকেতনে পরিণত হয়েছে।
মাদারগঞ্জ দুর্গা মন্দিরের মূল চত্বরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সারি সারি সুসজ্জিত কক্ষ। প্রতিটি কক্ষে নিপুণ মৃৎশিল্পে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে হিন্দু পৌরাণিক ইতিহাসের বিরল ও তাৎপর্যপূর্ণ সব অধ্যায়। রঙিন পোশাক ও অলংকারে সাজানো দেবী দুর্গার অভয়মুদ্রার পাশাপাশি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে মহাবীর বার্বরীক ও শ্রীকৃষ্ণের দৃশ্য, মা যশোদার বাৎসল্য লীলা, প্রজাপতি ব্রহ্মার অহংকার চূর্ণ, পাতালে বীর হনুমানের সাহায্য প্রার্থনা কিংবা শনিদেবের প্রতি পার্বতীর বর প্রদানের মতো কালজয়ী মহাকাব্যিক উপাখ্যান প্রতিমার মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
তবে এই মন্দিরের সবচেয়ে প্রশংসনীয় ও ব্যতিক্রমী দিক হলো এর দেওয়ালে দেওয়ালে খোদাই করা বার্তা ও সামাজিক বাণীসমূহ। মন্দিরের দেওয়ালে লেখা রয়েছে,
শান্তির বার্তা: ‘যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই’
পরিবেশ সংরক্ষণ: ‘গাছ কাটা অভিশাপ, গাছ বাঁচানো পুণ্য’
নৈতিকতা ও শিক্ষা: ‘আত্মাকে জানলে, ঈশ্বরকে জানবে’, ‘আমি ভালো হতে চাই’, এবং ‘আমি যেন শিক্ষিত হতে চাই, পাশাপাশি ভালো মানুষও হতে চাই’
আধ্যাত্মিক ভাবনা: ‘নদী যেমন সাগরে বিলীন হয়, ভক্তিতে ভক্ত ভগবানে মিশে যায়’
ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সামাজিক ও পরিবেশগত সচেতনতার এই অনন্য সমন্বয় শিশু-কিশোর ও নতুন প্রজন্মের কাছে মানবিক গুণাবলি বিকাশের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।
মাদারগঞ্জ দুর্গা মন্দির কমিটির সদস্য জগন্নাথ চন্দ্র জানান, এবার মূলত শনি দেবকে কেন্দ্র করে থিম সাজানো হয়েছে। এর পাশাপাশি রামায়ণ, মহাভারত এবং পরিবেশ সুরক্ষার তাগিদে ‘বিবর্তনবাদ’ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। সম্প্রতি নেপালের হিমবাহ ধসের মতো মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে প্রতীকী নদী, কচ্ছপ ও প্রাণীকূলের মাধ্যমে ক্ষুদ্র পরিসরে প্রদর্শন করা হয়েছে।
মন্দির কমিটির সভাপতি অমিত কুমার চৌধুরী বলেন, "নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শিকড় ও পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে পরিচিত করার পাশাপাশি মন্দিরের দেওয়ালে শান্তি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবিকতার বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য মানুষ যেন ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়ার অনুপ্রেরণা লাভ করে এবং সমাজে সম্প্রীতি বজায় রাখে।"
মন্তব্য করুন