চুম্বন ও ধর্ষণের দৃশ্যে অভিনয় না করার শর্ত দেওয়ায় নানা সমালোচনার মুখে পড়েছেন সিঙ্গাপুরের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রুই এন। নারীদের ট্রমা প্রদর্শনের প্রচলিত ধারা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
পর্দায় চুম্বনের মতো অন্তরঙ্গ দৃশ্য কিংবা কোনো ধরনের সংবেদনশীল ধর্ষণের দৃশ্যে অভিনয় না করার সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিগত নীতি বজায় রাখায় দীর্ঘ ক্যারিয়ারজুড়ে নানা নেতিবাচক মন্তব্য ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছেন সিঙ্গাপুরের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রুই এন। সম্প্রতি ইউটিউবার এইকেন চিয়ার জনপ্রিয় টক শো ‘হার্ট টু হার্ট’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে নিজের অভিনয় জীবনের এমন কঠিন ও নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে এনেছেন তিনি। একই ধরনের শর্ত বা রক্ষণশীল অবস্থান নেওয়া জ্যেষ্ঠ পুরুষ সহশিল্পীরা থাকলেও কেবল নারী হওয়ার কারণেই তাঁকে বারবার ‘ডিফিকাল্ট’ বা ‘ডিভা’র মতো আপত্তিকর তকমা সহ্য করতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেন এই তারকা।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সিঙ্গাপুরের বিনোদন ও টেলিভিশন নাট্যজগতে রাজত্ব করা রুই এন জানান, ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই পর্দায় রোমান্টিক চুম্বন বা অন্তরঙ্গ দৃশ্য তাঁকে ভীষণ অস্বস্তিতে ফেলত। বিশেষ করে ধর্ষণের দৃশ্যের ক্ষেত্রে তাঁর আপত্তি ছিল আরও অনেক বেশি কঠোর ও স্পষ্ট। তাই ক্যারিয়ারের শুরুতেই তিনি পণ করেছিলেন যে, চিত্রনাট্যে এমন আপত্তিকর দৃশ্য রয়েছে এমন কোনো চরিত্রের অফার তিনি গ্রহণ করবেন না। প্রযোজকদের তিনি বারবার অনুরোধ করতেন যাতে চিত্রনাট্য থেকে এই ধরনের দৃশ্যগুলো বাদ দেওয়া হয় অথবা অন্য কোনো বিকল্প পন্থায় দৃশ্যগুলো ধারণ করা হয়।
অভিনয়ের এই ব্যক্তিগত সীমারেখা টানার কারণে পেশাগত জীবনে নানা বৈষম্যের শিকার হতে হয়েছে বলে জানান রুই এন। পুরুষ শিল্পীরা একই ধরনের শর্ত জুড়ে দিলেও তাদের পেশাদার হিসেবে ছাড় দেওয়া হতো, অথচ নারী হওয়ার কারণে তাঁকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। শুধু ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য রক্ষা নয়, পর্দায় নারীর ওপর নির্যাতন, কষ্ট ও ট্রমা দেখানোর প্রচলিত ধারারও তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। রুই এন প্রশ্ন তোলেন, কোনো নারী চরিত্রকে দর্শকের কাছে সহানুভূতিশীল বা গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য কেন বারবার তাঁর ওপর চলা ট্রমা বা নির্যাতনকে বিনোদনের উপাদান হিসেবে দেখাতে হবে? বাস্তব জীবনে লাখো মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা হলেও বিনোদনের স্বার্থে একে অতিরঞ্জিত করার ঘোর বিরোধী তিনি।
মডেলিংয়ের মাধ্যমে মাত্র ১৮ বছর বয়সে বিনোদনজগতে প্রবেশ করা রুই এন পরবর্তীতে সিঙ্গাপুরের টিভি নাটক ও সংগীতাঙ্গনে ব্যাপক তারকাখ্যাতি অর্জন করেন। ২০১১ সালের দিকেও তিনি এই অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন, যখন একটি নাটকের দৃশ্যকে জোর করে ধর্ষণের দৃশ্য বানানোর চেষ্টার প্রতিবাদ করেছিলেন তিনি। এমনকি তাঁর এই কঠোর নীতি দেখে অনেকেই তাঁকে সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে, এভাবে চললে মিডিয়াতে তাঁর কোনো ক্যারিয়ার টিকবে না। কিন্তু সমস্ত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তিনি নিজের অবস্থানে আজও অনড় রয়েছেন।
২০২১ সালে ৪০ বছর বয়সে এসে গতানুগতিক ব্যবস্থাপনা সংস্থার সঙ্গে চুক্তি শেষ করে স্বাধীনভাবে কাজ শুরু করেন রুই এন। বর্তমানে অভিনয় ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করা এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলার প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁর এই সাহসী অবস্থান এবং শিল্পের বাণিজ্যিক স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজের মূল্যবোধ বজায় রাখার লড়াই বিশ্বজুড়ে শিল্পসংস্কৃতির অঙ্গনে নতুন এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মন্তব্য করুন