বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক এমডি সাফিকুর রহমানের বাসায় শিশু গৃহকর্মী মোহনার ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের সত্যতা পেয়ে সাফিকুর ও তাঁর স্ত্রীসহ ৪ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ।
পরিবারের চরম অভাব-অনটন দূর করতে ও একটু সচ্ছলতার আশায় উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার আলিশান ফ্ল্যাটে শিশু গৃহকর্মীর কাজ নিয়েছিল মাত্র ১১ বছর বয়সী মোহনা। তবে সেখানে বাচ্চার দেখভালের আড়ালে নামিয়ে আনা হয় মধ্যযুগীয় পৈশাচিক নির্যাতন। দীর্ঘদিন ধরে বাথরুমে বন্দি রেখে অমানুষিক শারীরিক অত্যাচার, খুন্তির ছ্যাঁকা এবং বাটনা বাটার পুঁতা দিয়ে দাঁত ভেঙে ফেলার মতো নৃশংস ঘটনার সত্যতা পেয়ে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে পুলিশ। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বিথী আক্তার এবং বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমকে অভিযুক্ত করে আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও উত্তরা পশ্চিম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রোবেল মিয়া। চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি বর্তমানে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭-এ বিচারে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশ তুলে ধরেছে কীভাবে এক অবুঝ শিশুকে দিনের পর দিন খাবার না দিয়ে স্যাঁতসেঁতে ভেজা বাথরুমে আটকে রাখা হতো। ক্ষিধে ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে বাথরুমের ট্যাপের পানি এবং দাঁত মাজার পেস্ট খেয়ে টিকে থাকত শিশু মোহনা। অসুস্থ হলে বা কাজের সামান্য ভুলের অজুহাতে চুলার আগুনে গরম করা লোহার খুন্তি দিয়ে শরীরের সংবেদনশীল অংশে ছ্যাঁকা দেওয়া হতো এবং পেটাতে ব্যবহার করা হতো বাঁশের কঞ্চি। এমনকি পুরো শীতকাল জুড়েই তাকে গরম কাপড় না দিয়ে ভেজা মেঝতেই ফেলে রাখা হয়েছিল, যার ফলে তার পায়ে পচন ধরেছিল। মেয়েকে দেখতে যখন বাবা আসতেন, তখন ওপর দিয়ে বড় পোশাক পরিয়ে দূর থেকে দাঁড় করিয়ে রাখা হতো যেন ভেতরের ক্ষত ও পচনের কোনো দাগ বাইরে থেকে বোঝা না যায়।
রাষ্ট্রীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে থেকেও নিজ বাসভবনে চোখের সামনে চলা এই হাড়হিম করা পাশবিকতা দেখেও নীরব ভূমিকা পালন করার কারণে সাফিকুর রহমানের বিরুদ্ধেও অপরাধে যোগসাজশের দায় আনা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটে সাফিকুর রহমানের স্ত্রীকে অমানবিক আচরনের জন্য অভিযুক্ত করার পাশাপাশি স্পষ্ট উল্লেখ করেন যে, সাবেক এই কর্মকর্তা স্ত্রীর পৈশাচিক নির্যাতন থামানোর কোনো উদ্যোগ না নিয়ে তা দেখেও না দেখার ভান করে থেকেছেন। তাই আইনত তিনি এই অপরাধের দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না।
আদালতের খাসকামরায় ফৌজদারি কার্যবিধির ২২ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে নির্যাতিত শিশু মোহনা জানায়, কারণে-অকারণে তাকে বেধড়ক পেটানোর পাশাপাশি চোখে মরিচের গুঁড়া চেপে ধরা হতো এবং বাটনা বাটার শিল-পুঁতা দিয়ে আঘাত করে তার দাঁত ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে বিথী আক্তার হঠাৎ ফোন করে মোহনার বাবাকে এসে মেয়েকে নিয়ে যেতে বলেন। গত ৩১ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গুরুতর জখম, শরীর জুড়ে পোড়া ক্ষত ও কথা বলতে অক্ষম অবস্থায় মেয়েকে ফেরত পান বাবা গোলাম মোস্তফা। এরপরই তাকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং গত ১ ফেব্রুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানায় মামলা দায়ের করা হয়।
ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) জানিয়েছেন, একটি নিরীহ শিশুর ওপর চালানো এই পৈশাচিকতা সম্পূর্ণ সভ্যতাবিরোধী এবং বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো ঘটনা। আসামি যতই প্রভাবশালী বা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হোন না কেন, রাষ্ট্রের হাতে চিকিৎসা প্রতিবেদন, ভুক্তভোগীর স্বীকারোক্তি ও ফরেনসিক প্রমাণসহ পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ রয়েছে। দ্রুততম সময়ে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচারে আসামিদের সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপক্ষ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। বর্তমানে সাফিকুর রহমান ও এক গৃহকর্মী জামিনে থাকলেও তাঁর স্ত্রী বিথী আক্তারসহ অপর গৃহকর্মী সুফিয়া বেগম কারাগারে আটক রয়েছেন।
মন্তব্য করুন