সৌদি আরবের পারিবারিক ও সামাজিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘকাল ধরে ‘মজলিস’ বা মুখোমুখি বসে খোলামেলা আড্ডা এবং খোঁজখবর নেওয়ার ঐতিহ্য চলে আসছে। তবে সময়ের পরিবর্তনে এবং প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই ঐতিহ্য এখন রূপ নিয়েছে ‘ডিজিটাল মজলিসে’। পরিবারের বিভিন্ন প্রান্তের সদস্যদের যুক্ত করে তৈরি করা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলো বর্তমানে সৌদি পরিবারগুলোতে যোগাযোগের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
পারিবারিক বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় নানা রকম বার্তা বিনিময়। সকালের শুভেচ্ছা বিনিময়, পুরোনো স্মৃতির ছবি শেয়ার করা, বিয়ের খবর কিংবা শুক্রবারের বিশেষ খাবারের আয়োজন—সবকিছু নিয়েই চলে আলোচনা। ২৭ বছর বয়সী লামা আল-কাহতানি জানান, তার পরিবারের এই গ্রুপটি একই সঙ্গে একটি পারিবারিক নোটিশ বোর্ড, স্মৃতির আর্কাইভ এবং নিরন্তর কথোপকথনের একটি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম। সেখানে কখনো ঘুম থেকে উঠেই অর্ধশতাধিক বার্তা জমে থাকতে দেখা যায়।
সৌদির কমিউনিকেশনস, স্পেস অ্যান্ড টেকনোলজি কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার প্রায় ৯৯ শতাংশ এবং এর প্রায় পুরোটাই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এছাড়া দেশটির ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশই হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেন। এই ব্যাপক প্রযুক্তিনির্ভরতার ফলেই পারিবারিক বন্ধন রক্ষায় অ্যাপটির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। সন্তান জন্ম নেওয়া, বাগদান, মৃত্যুসংবাদ কিংবা শোক ও অভিনন্দন জানানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য এখন মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে এসব গ্রুপে।
দীর্ঘদিন ধরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসা প্রথাগত মজলিসের বিকল্প হিসেবে হোয়াটসঅ্যাপ তৈরি হয়নি; বরং মুখোমুখি সাক্ষাতের মধ্যবর্তী সময়গুলোতে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ টিকিয়ে রাখতে এটি একটি কার্যকর ডিজিটাল সেতু হিসেবে কাজ করছে। কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজনে দূরে থাকা ৩৪ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আল-হারবি জানান, ব্যক্তিগতভাবে কাউকে ফোন করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো কারণ লাগে, কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পরিবারের দৈনন্দিন ছোটখাটো মুহূর্তগুলো শেয়ার করার মাধ্যমে দূরে থেকেও পরিবারের সান্নিধ্য অনুভব করা যায়।
তবে এর কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। গবেষক ও ব্যবহারকারীদের মতে, প্রায়শই ভুল তথ্য বা গুজব ছড়িয়ে পড়া এবং যেসব বয়স্ক স্বজন এখনো স্মার্টফোন বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে অভ্যস্ত নন, তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ খবর পৌঁছানো কিছুটা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়া পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের ব্যবহারের ধরনও আলাদা; যেখানে তরুণরা ছোট বার্তা ও মিম শেয়ার করেন, সেখানে বয়স্করা ভয়েস নোট বা ছবি পাঠাতে পছন্দ করেন। ৫৬ বছর বয়সী সারা আল-দোসারির মতে, ব্যস্ত জীবনে সবার খোঁজ নেওয়ার জন্য এটি দারুণ হলেও সামনা-সামনি বসে আড্ডা দেওয়ার আনন্দ বা বিকল্প কখনোই ডিজিটাল মাধ্যম হতে পারে না।
মন্তব্য করুন