ফ্রান্সজুড়ে স্কুল শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলন দিন দিন আরও তীব্র ও সহিংস রূপ ধারণ করেছে। শিক্ষক সংকট, অপর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, অতিরিক্ত গরম শ্রেণিকক্ষ এবং দীর্ঘ ক্লাস সময়ের প্রতিবাদে রাজপথে নেমে আসা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্থানে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক ও স্কুলের প্রবেশপথ অবরুদ্ধ করে রেখেছে। শিক্ষামন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির অন্তত ৪০০টি স্কুল পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে এবং ৩ হাজার ৭০০টি উচ্চবিদ্যালয়ের মধ্যে প্রায় ৫৬৪টিতে শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মনে হচ্ছে ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা এখন প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে প্যারিস অঞ্চলে এই ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, যা বর্তমানে দাবানলের মতো দেশের অন্যান্য শহরেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্যারিসের কেন্দ্রীয় একটি স্কুলের ১৫ বছর বয়সি শিক্ষার্থী সাইমন গণমাধ্যমের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, তাদের স্কুলে এক বছর ধরে কোনো বিজ্ঞান শিক্ষক নেই এবং পাঠ্যবইয়েরও চরম সংকট রয়েছে। বিশেষ করে শহরতলির স্কুলগুলোর অবস্থা আরও বেশি শোচনীয় বলে অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থীরা। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর ব্রেস্টে কেরিশেন উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ও বিভিন্ন বস্তু ছুড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে হয়। পূর্বাঞ্চলীয় বেলফোর শহরে বিক্ষোভকারীদের হাতে এক পুলিশ সদস্য আক্রান্ত হওয়ার ঘটনায় ১৭ বছর বয়সী এক তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ এই সহিংসতাকে ‘অসহনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ তুলেছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, পুলিশের মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের ফলে বহু সাধারণ শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় তুলুজ শহরে কাঁদানে গ্যাসের ঝাঁঝে শিক্ষার্থীদের চোখে তীব্র জ্বালাপোড়া সৃষ্টি হলে একে অপরকে চোখের ড্রপ দিতে দেখা যায়। পুলিশের বিরুদ্ধে তিনজন বিক্ষোভকারীকে মারধরের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পর দেশটির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজ থেকেই একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে। এদিকে প্যারিসের উত্তরে অবস্থিত অবারভিলিয়েতে পরিস্থিতি শান্ত করতে পুলিশকে লাঠি ও ভারী দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের এই রাজপথের আন্দোলন দেশটির জাতীয় রাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকতে বর্তমান সরকার দাবি করেছে যে, বামপন্থি রাজনৈতিক দল ‘ফ্রান্স আনবোডের’ নেতৃবৃন্দ এবং আসন্ন নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থী জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর দল এই আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে উসকে দিচ্ছে। তবে দলটির অপর নেতা ম্যানুয়েল বমপার সরকারের এই দাবিকে সম্পূর্ণ ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছেন। ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে অভিযোগ করেছেন যে, কিছু চরমপন্থী গোষ্ঠী সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে হাইজ্যাক বা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। তার দেওয়া তথ্যমতে, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ৬৫ জন স্কুলকর্মী আহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৪০ জনই প্রধান শিক্ষক। এছাড়া প্রায় ১৭০ জন শিক্ষার্থী আহত হওয়া ছাড়াও একশর বেশি স্কুলে গুরুতর ভাঙচুর ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরহস্তে দমনের ঘোষণা দিয়ে ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানিন জানিয়েছেন, বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের কারণে যদি কোনো সরকারি বা বেসরকারি সম্পত্তির ক্ষতি হয়, তবে তার আর্থিক ক্ষতিপূরণ সংশ্লিষ্ট অভিভাবকদের কাছ থেকেই আদায় করতে প্রসিকিউটরদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার মানুষকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী। উত্তাল এই পরিস্থিতিতে ফরাসি সরকার ও শিক্ষার্থীদের মধ্যকার সংঘাত নিরসনে দ্রুত কোনো রাজনৈতিক সমাধান আসবে কি না, তা নিয়ে এখন গোটা ফ্রান্সে গভীর অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
মন্তব্য করুন