|
দ্রুত লিংক
বিভাগসমূহ
মিডিয়া বিভাগ
Dhaka Files
প্রকাশ : Sep 19, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

কোরবানির চামড়ার বাজার ধস: সিন্ডিকেট নাকি ক্যাশ-ফ্লো সংকট

প্রতিবছর কোরবানি ঈদ ঘনিয়ে এলেই দেশের কাঁচা চামড়ার বাজার নিয়ে নানা বিতর্ক, নৈরাজ্য আর দরপতনের চিত্র সামনে চলে আসে। মাঠপর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ যে ট্যানারি মালিক ও আড়তদাররা সিন্ডিকেট করে ইচ্ছেকৃতভাবে চামড়ার দাম কমিয়ে দেন, যার ফলে তারা মূলধন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন। অন্যদিকে, ট্যানারি মালিকদের রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন যুক্তি। তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় চামড়ার চাহিদা দিন দিন কমছে এবং সাভারের সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বা সিইটিপির ব্যর্থতার কারণে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত সনদ তথা এলডব্লিউজি না থাকায় তারা বড় কোনো বায়ার বা ক্রেতা পাচ্ছেন না। পাশাপাশি রাসায়নিক ও সার্বিক উৎপাদনের ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় বেশি দামে কাঁচা চামড়া কেনা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার মধ্যস্বত্বভোগী আড়তদাররা আঙুল তুললে তারা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের চড়া খরচের হিসাব সামনে নিয়ে আসেন। তাদের মতে, পশু জবাইয়ের পর চামড়া সংগ্রহ, তাতে সঠিক সময়ে লবণ প্রয়োগ, পরিবহন খরচ, শ্রমিকের মজুরি, গুদাম ভাড়া এবং ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ পরিশোধ করার পর কেনা ও বিক্রির মধ্যকার ব্যবধানকে কোনোভাবেই এককভাবে পকেটের মুনাফা বলা চলে না।

কোরবানির মৌসুমে দেশে প্রায় কোটি পিস চামড়া বাজারে আসলেও পর্যাপ্ত সংরক্ষণের অভাবে এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশই নষ্ট হয়ে যায়। হাজারীবাগের ঐতিহাসিক ট্যানারিগুলো সাভারে স্থানান্তরিত হওয়ার পর বিসিকের বরাদ্দকৃত প্লটগুলোর মধ্যে কার্যকর কারখানার সংখ্যা অর্ধেকেরও নিচে নেমে মাত্র ১৫৫ থেকে ১৫৬টিতে দাঁড়িয়েছে। ট্যানারি মালিকদের তীব্র মূলধন সংকট এবং ব্যাংক ঋণের চাপে বাজারে ‘কার্যকর ক্রেতা’ বা সচ্ছল ক্রেতার চরম আকাল দেখা দেওয়ায় প্রচুর জোগান থাকা সত্ত্বেও চামড়ার দাম তলানিতে গিয়ে ঠেকে এবং বাজার ধসে পড়ে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এই সংকটের মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে, বাংলাদেশে চামড়া উৎপাদনের তুলনায় প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর ক্রেতার সংখ্যা অত্যন্ত কম, যা মূলত দরপতনের প্রধান অনুঘটক। বিসিকের হিসাব অনুযায়ী, কোরবানির মৌসুমে প্রায় ৫৬ লাখ ৭০ হাজার পিস গরুর চামড়াসহ বিপুল পরিমাণ ছাগল ও ভেড়ার চামড়া বাজারে আসে। কিন্তু চামড়া ছাড়ানোর ৪ থেকে ৬ ঘণ্টার মধ্যে পর্যাপ্ত লবণ ব্যবহার না করায় ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে কোলাজেন ফাইবার নষ্ট হয়ে যায় এবং জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে আধুনিক সংগ্রাহক কেন্দ্র না থাকায় প্রতিবছর কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট হয়।

এই পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল ভেঙে পড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে ব্যাংক ঋণের ভয়াবহ সংকট ও খেলাপি ঋণের বিষচক্র। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে চামড়া খাতে ঋণ বিতরণের সামান্য লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও পূর্ববর্তী বছরগুলোতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও খেলাপি ঋণের কারণে প্রকৃত বিতরণ ছিল মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি। বর্তমানে এই খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ এই ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে ব্যাংকগুলো নতুন করে কোনো ঋণ দিতে অস্বীকৃতি জানায়, যার ফলে ট্যানারি মালিকদের হাতে চামড়া কেনার মতো প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ থাকে না। নগদ টাকার অভাবে ট্যানারি মালিকরা আড়তদারদের বাকিতে চামড়া সরবরাহ করতে বলেন অথবা পূর্বের বকেয়া পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন। এর ফলে আড়তদাররাও মাঠপর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পাওনা মেটাতে পারেন না এবং পুরো অর্থপ্রবাহ বা ক্যাশ-ফ্লো স্তব্ধ হয়ে বাজারে চরম নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়।

এত সব জটিলতা ও হতাশার মধ্যেও দেশের চামড়াশিল্পে আশার আলো দেখছেন শীর্ষ উদ্যোক্তারা। অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর মনে করেন, বর্তমানে চামড়া ও পাদুকা খাত থেকে যে পরিমাণ রপ্তানি আয় আসছে, সঠিক নীতিগত সহায়তা, সাভারের সিইটিপি আধুনিকায়ন এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা সহজ করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই খাত থেকে বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। এছাড়া বর্তমান সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সিইটিপির সংস্কার বা নতুন করে আন্তর্জাতিক মানের সিইটিপি নির্মাণ, কঠিন বর্জ্য থেকে বাই-প্রোডাক্ট তৈরি এবং অকার্যকর ট্যানারিগুলোর জন্য গ্রেসফুল এক্সিট বা সম্মানজনক উপায়ে ব্যবসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার মতো সময়োপযোগী মাস্টার প্ল্যান হাতে নেওয়া হয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, কেবল সিন্ডিকেটের দোষ না দিয়ে ব্যাংক ঋণের ক্যাশ-ফ্লো সংকট দূর করা, সিইটিপির কার্যকর সংস্কার এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমেই কেবল এই সোনালি খাতের প্রকৃত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

১০,০০০ এমএএইচ ব্যাটারির বিশাল ক্ষমতা নিয়ে অফিসিয়ালি লঞ্চ হলো

1

নদী দূষণ রোধে সমন্বিত পদক্ষেপে অবহেলার সুযোগ নেই: প্রধানমন্ত

2

ভারত-পানামা ফুটবল ম্যাচের সূচিতে পরিবর্তন, ম্যাচ হবে ২৫ সেপ্

3

দেশের ১১ জেলায় ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্কস

4

হাইকোর্টে বাড়ছে রিট নিষ্পত্তি: বিচারিক শৃঙ্খলায় কমবে মামলা

5

তেহরান সফরে যাচ্ছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনি

6

চতুর্থ সন্তানের বাবা হলেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যা

7

ওসমান হাদি হত্যার বিচার চাইল ইনকিলাব মঞ্চ

8

ইউএস ওপেনের সেমিফাইনালে টিয়াফো, হৃদয়বিদারক হারে কেঁদে ফেললেন

9

সিলেটে বৈষম্যবিরোধী মামলার আসামি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা দেলোয

10

সাউথইস্ট ব্যাংকের কর্পোরেট পরিচালকের ১ কোটি ৮০ লাখ শেয়ার বিক

11

জামায়াত-বিএনপি ছাড়ার আল্টিমেটাম, নতুন জোট চায় হেফাজত আমির

12

যুবদল নেতা মাসুদ হত্যাকাণ্ড ও থমথমে রাউজান

13

শুধু সম্পদ বৃদ্ধিই কি বরকত? প্রকৃত সমৃদ্ধির রহস্য জানুন

14

সিলেটের ডিসি সারওয়ার আলমের মাজার অভিযান ও অন্দরমহলের বিতর্ক

15

আইএমএফের শর্ত থেকে সরে আসছে সরকার: নতুন ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা

16

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শুরু: নেপালের বন্যায় শো

17

নৌ-পুলিশ কর্মকর্তার অস্বাভাবিক আচরণের ভিডিও ভাইরাল, প্রত্যাহ

18

দুই মামলায় স্থায়ী জামিন পেলেন আমির হামজা

19

রাতের বেলায় নারীদের বিনামূল্যে রিকশা সেবা দিচ্ছেন গুজরাটের

20