মাধ্যমিক বা এসএসসি পরীক্ষার গণ্ডি পেরোনোর পর থেকেই অনেক শিক্ষার্থী দেশের পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পর্যায়ের পাশাপাশি স্কুল পর্যায় থেকেই বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মনে প্রায়ই একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খায় বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এসএসসির রেজাল্ট বা সার্টিফিকেটের প্রকৃত গুরুত্ব কতখানি?
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে কাজ করা পরামর্শকদের মতে, বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে এসএসসি বা মাধ্যমিকের ফলাফল সম্পূর্ণ মূল্যহীন না হলেও এটি কোনো একক বা প্রধান নির্ধারক বা ডিসাইডিং ফ্যাক্টর নয়। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা ইউরোপের বেশিরভাগ উন্নত দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য সাধারণত ১২ বছরের স্কুলিং বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এসএসসি পর্যন্ত ১০ বছরের পড়াশোনা ধরা হয়, তাই মাধ্যমিক পাস করার পর সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তির সুযোগ থাকে না। এসএসসির পর দেশের বাইরে যেতে চাইলে শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম অনুযায়ী ফাউন্ডেশন কোর্স, ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম কিংবা ও-লেভেল শেষ করে এ-লেভেলে ভর্তি হতে হয়।
বেশিরভাগ দেশের বিশ্ববিদ্যালয় বা মূল্যায়ন সংস্থাগুলো মূলত তিনটি সুনির্দিষ্ট কারণে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলকে বিবেচনা করে থাকে। প্রথমত, এটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা যাচাই করতে এবং শিক্ষাজীবনে কোনো বড় ধরনের বিরতি বা স্টাডি গ্যাপ রয়েছে কি না তা দেখতে সাহায্য করে। দ্বিতীয়ত, অ্যাকাডেমিক প্রগ্রেস বা উন্নতির ধারা যাচাই করার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়; যেমন এসএসসির চেয়ে এইচএসসি এবং পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ফলাফলের মান উন্নত হতে থাকে, তবে সেটিকে একটি বড় পজিটিভ পয়েন্ট বা আপওয়ার্ড ট্রেন্ড হিসেবে ধরা হয়। তৃতীয়ত, কিছু নির্দিষ্ট দেশ বা প্রতিষ্ঠানে ফাউন্ডেশন কোর্সে ভর্তির জন্য এসএসসিতে একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম নম্বর বা বেঞ্চমার্ক বজায় রাখার শর্ত থাকে।
উচ্চমাধ্যমিক বা এইচএসসি শেষ করে যারা সরাসরি স্নাতক বা ব্যাচেলর ডিগ্রির জন্য বিদেশে আবেদন করেন, তাদের ক্ষেত্রে এসএসসির ফলাফল একটি সহায়ক বা সাপোর্টিং ডকুমেন্ট হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। বিশেষ করে মেডিসিন, ইঞ্জিনিয়ারিং বা আইনশাস্ত্রের মতো অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিষয়গুলোতে এসএসসির বিজ্ঞান, গণিত বা ইংরেজির মতো মূল বিষয়গুলোর নম্বর বা গ্রেড বেশ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হয়। তবে কেউ যদি পরবর্তীতে মাস্টার্স, এমফিল বা পিএইচডি করার উদ্দেশ্যে বিদেশে আবেদন করেন, তবে সেক্ষেত্রে এসএসসির ফলাফলের গুরুত্ব প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। উচ্চতর ডিগ্রির ক্ষেত্রে কেবল সর্বশেষ অর্জিত ডিগ্রি অর্থাৎ অনার্সের সিজিপিএ, গবেষণার অভিজ্ঞতা, স্টেটমেন্ট অফ পারপাস বা এসওপি এবং আইইএলটিএস বা পিটিই-র মতো ইংরেজি ভাষা দক্ষতার স্কোরই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে আমাদের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যার ফলে শিক্ষার্থীদের বিদেশে গিয়ে অনেক সময় নতুন করে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়। তা সত্ত্বেও এসএসসির পরে বিদেশে উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনা থাকলে ভালো গ্রেড পয়েন্ট ধরে রাখার পাশাপাশি ভাষাগত দক্ষতা অর্জন এবং পর্যাপ্ত আর্থিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
মন্তব্য করুন