আলঝেইমার্স রোগের চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের দাবি করেছেন স্পেন ও সুইজারল্যান্ডের একদল গবেষক. তারা ‘ওএলই’ (OLE) নামের এমন একটি পরীক্ষামূলক অণু চিহ্নিত করেছেন, যা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে. এই যৌগটি মস্তিষ্কের রোগ প্রতিরোধক কোষ ‘মাইক্রোগ্লিয়া’-কে নতুনভাবে পুনর্গঠন করে, যার ফলে কোষগুলো তাদের হারিয়ে যাওয়া সুরক্ষামূলক ক্ষমতা আবার ফিরে পায়. স্প্যানিশ ন্যাশনাল決রিসার্চ কাউন্সিল, মিগুয়েল হার্নান্দেজ ইউনিভার্সিটি অব এলচে-এর যৌথ কেন্দ্র ‘ইনস্টিটিউট ফর নিউরোসায়েন্সেস’ এবং সুইজারল্যান্ডের ইকোলে পলিটেকনিক ফেডারেলে ডি লাউসেন-এর বিজ্ঞানীদের যৌথ নেতৃত্বে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়. গবেষণার বিস্তারিত ফলাফল আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘セル ডেথ অ্যান্ড ডিজিজেস’-এ প্রকাশিত হয়েছে.
আলঝেইমার্স রোগের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মস্তিষ্কে ক্ষতিকারক ‘বিটা-অ্যামাইলয়েড প্ল্যাক’ বা এক ধরণের আঠালো প্রোটিন জমা হওয়া. সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের মাইক্রোগ্লিয়া কোষগুলো যা সাধারণত এই বিষাক্ত বর্জ্য অপসারণে সাহায্য করে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং উল্টো মস্তিষ্কের ক্ষতি করতে শুরু করে.
বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে, পিএম২০ডি১ (PM20D1) জিন দ্বারা উৎপাদিত ‘ওএলই’ অণুটি মাইক্রোগ্লিয়া কোষকে পুনরায় সক্রিয় করে তোলে. চিকিৎসার পর দেখা যায়, মাইক্রোগ্লিয়া কোষগুলো ক্ষতিকারক বিটা-অ্যামাইলয়েড প্ল্যাকের দিকে ধাবিত হয় এবং এর চারপাশে একটি সুরক্ষামূলক প্রাচীর তৈরি করে. এর ফলে বিষাক্ত প্ল্যাকগুলো সরাসরি আশেপাশের নিউরনের সংস্পর্শে আসতে পারে না, যা মস্তিষ্কের টিস্যুর ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়. গবেষণাগারের প্রধানের মতে, আলঝেইমার্স রোগে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়া এই কোষগুলোর সুরক্ষামূলক ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়াটি উল্টে দেওয়া বা রিভার্স করা সম্ভব.
গবেষণার কার্যকারিতা যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষাগারে বিভিন্ন জীবন্ত মডেলের ওপর সফল পরীক্ষা চালিয়েছেন:
কৃত্রিমভাবে বিটা-অ্যামাইলয়েড তৈরি করা জেনেটিক্যালি মডিফাইড কৃমির ওপর ওএলই প্রয়োগ করায় প্রোটিন জমার পরিমাণ কমে যায় এবং তাদের শারীরিক নড়াচড়ার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে.
অন্যদিকে, আলঝেইমার্স আক্রান্ত ল্যাবরেটরির ইঁদুরকে টানা তিন মাস ওএলই চিকিৎসা দেওয়ার পর দেখা গেছে যে, তাদের স্মৃতিশক্তি পরীক্ষার পারফরম্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে. একই সাথে তাদের মস্তিষ্কে বিটা-অ্যামাইলয়েড প্ল্যাকের পরিমাণ সাধারণ ইঁদুরের তুলনায় অনেক কমে গেছে.
একক-কোষ বিশ্লেষণের মাধ্যমে গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, এই চিকিৎসায় মস্তিষ্কের সব কোষের মধ্যে মাইক্রোগ্লিয়াই সবচেয়ে জোরালো সাড়া দিয়েছে. ওএলই-এর সংস্পর্শে আসার পর মাইক্রোগ্লিয়া কোষগুলো ক্ষতিকারক প্রোটিন পরিষ্কার করার পথগুলো সচল করে তোলে. কোষ কালচার বা ল্যাব টেস্টেও দেখা গেছে যে ওএলই আক্রান্ত নিউরনের বেঁচে থাকার হার বাড়ায়, যা ইঙ্গিত করে যৌগটি সরাসরি নিউরনকেও রক্ষা করতে পারে.
এনডিটিভির সূত্র অনুযায়ী, এই নতুন আবিষ্কারটি ইতোমধ্যে দুটি ইউরোপীয় পেটেন্টের (যার একটির মালিক স্পেনের সিএসআইসি) আওতাভুক্ত হয়েছে. গবেষকদের মতে, এই পেটেন্টগুলো গবেষণাগারের আবিষ্কারকে বাস্তব চিকিৎসায় রূপান্তর করার প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করবে এবং ভবিষ্যতে আলঝেইমার্সের কার্যকর ওষুধ তৈরির পথ সুগম করবে.
মন্তব্য করুন