ফুটবল বিশ্বকাপ শুধু শিরোপা জয়ের গল্প নয়, এটি অবিস্মরণীয় কিছু ম্যাচেরও নাম। কয়েক দশক ধরে বিশ্বকাপ মঞ্চে এমন অনেক লড়াই হয়েছে, যা এখনো ফুটবলপ্রেমীদের স্মৃতিতে অমলিন। নাটকীয় প্রত্যাবর্তন, অতিরিক্ত সময়ের রুদ্ধশ্বাস লড়াই, টাইব্রেকারের উত্তেজনা আর কিংবদন্তিদের অসাধারণ পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে তৈরি ফিফার তথ্য অনুযায়ী বিশ্বকাপ ইতিহাসের ১০টি সেরা ও রোমাঞ্চকর ম্যাচ নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
গ্রুপ পর্বে তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসে টগবগ করছিল পর্তুগাল। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তর কোরিয়া প্রথমেই ৩-০ গোলে এগিয়ে গিয়ে সবাইকে চমকে দেয়। এরপর কিংবদন্তি ইউসেবিওর চার গোলের দুর্দান্ত নৈপুণ্যে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন করে ৫-৩ ব্যবধানে জয় ছিনিয়ে নেয় পর্তুগাল।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে ‘শতাব্দীর ম্যাচ’ হিসেবে পরিচিত এই লড়াইয়ে নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে সমতা ফেরায় পশ্চিম জার্মানি। এরপর অতিরিক্ত সময়ে দুই দল পাল্টাপাল্টি গোল করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত জিয়ান্নি রিভেরার করা চমৎকার গোলে ৪-৩ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় ইতালি।
দীর্ঘ সময় গোলশূন্য থাকার কারণে ইতালিয়ান তারকা পাওলো রসিকে দল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছিল। কিন্তু কোচ এনজো বেয়ারজট তার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন। সেই আস্থার প্রতিদান দিয়ে ম্যাচে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করেন রসি এবং তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্সে টুর্নামেন্টের অন্যতম শক্তিশালী দল ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়।
বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এই ম্যাচের মাধ্যমেই কোনো খেলার নিষ্পত্তি টাইব্রেকারে গড়ায়। অতিরিক্ত সময়ে ফ্রান্স ৩-১ গোলে এগিয়ে গেলেও জার্মানি দারুণভাবে ম্যাচে ফিরে আসে। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে ৪-৫ ব্যবধানে জয় পেয়ে ফাইনালে ওঠে পশ্চিম জার্মানি।
ম্যাচের শুরুতে কেরেকার গোলে এগিয়ে গিয়েছিল ব্রাজিল। পরে ফ্রান্সের ফুটবল কিংবদন্তি মিশেল প্লাতিনির গোলে সমতা ফেরে। পুরো ম্যাচজুড়ে চলা নাটকীয় লড়াই শেষে টাইব্রেকারে ৩-৪ ব্যবধানে জয় পায় ফরাসিরা।
রোমারিও ও বেবেতোর জোড়া গোলে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল সেবারের হট ফেভারিট ব্রাজিল। তবে নেদারল্যান্ডসও দমে না গিয়ে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় এবং ম্যাচে ২-২ সমতা ফেরায়। শেষ পর্যন্ত ব্রাঙ্কোর একটি দুর্দান্ত ফ্রি-কিকে ৩-২ গোলের জয় নিশ্চিত করে ব্রাজিল, যারা পরবর্তীকালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল।
মাইকেল ওভেনের অসাধারণ একক নৈপুণ্যের গোল, ডেভিড বেকহামের লাল কার্ড এবং দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই—সব মিলিয়ে ম্যাচটি হয়ে ওঠে বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় দ্বৈরথ। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ম্যাচটি ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে জয় পেয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো গোল না হলেও পুরো ম্যাচজুড়ে ছিল টানটান উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ। ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ হয় অতিরিক্ত সময়ে। প্রথমে ফাবিও গ্রোসো গোল করে ইতালিকে এগিয়ে দেন এবং এরপর আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো আরেকটি গোল করে ইতালির ফাইনাল খেলা নিশ্চিত করেন।
বিশ্বকাপের মঞ্চে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সেরা পারফরম্যান্সগুলোর একটি ছিল এই ম্যাচ। শক্তিশালী স্পেনের বিপক্ষে একাই হ্যাটট্রিক করেন সিআরসেভেন। বিশেষ করে ম্যাচের ৮৮ মিনিটে করা তাঁর দুর্দান্ত ফ্রি-কিক গোলটি পর্তুগালকে নিশ্চিত হারের হাত থেকে বাঁচিয়ে সমতায় ফেরায়।
ফুটবল বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, এটিই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফাইনাল। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা প্রথমার্ধ থেকেই শিরোপার পথে এগিয়ে থাকলেও কিলিয়ান এমবাপের জোড়া গোলে অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচে ফিরে আসে ফ্রান্স। অতিরিক্ত সময়েও দুই মহাতারকার গোলের পর ম্যাচ ৩-৩ সমতায় থাকলে খেলা গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে ৩-৪ ব্যবধানে জয় পেয়ে ৩৬ বছর পর নিজের দেশ ও কোটি ভক্তের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেন লিওনেল মেসি।
মন্তব্য করুন