রাতারাতি গায়ের রং ফর্সা করার তীব্র আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে বিশ্বজুড়ে গড়ে উঠেছে কোটি কোটি টাকার রং ফর্সাকারী প্রসাধনী বা স্কিন লাইটেনিং ক্রিমের বিশাল বাজার। বিজ্ঞাপনের চটকদার প্রলোভনে পড়ে অনেকেই যাচাই-বাছাই ছাড়াই ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত এসব ক্রিম মুখে নিয়মিত ব্যবহার করছেন। তবে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের মতে, সাময়িকভাবে ত্বক ফর্সা মনে হলেও, এই প্রসাধনীগুলো আসলে ত্বকের স্থায়ী সর্বনাশ ডেকে আনে এবং ক্যানসারসহ মারাত্মক সব শারীরিক জটিলতা তৈরি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং চর্মরোগ বিজ্ঞানীদের মতে, বাজারের অধিকাংশ রং ফর্সাকারী ক্রিমে মার্কারি বা পারদ, হাইড্রোকুইনোন এবং কড়া স্টেরয়েডের মতো বিপজ্জনক উপাদান ব্যবহার করা হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
কড়া স্টেরয়েডের নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের ওপরের সুরক্ষামূলক স্তর বা এপিডার্মিস সম্পূর্ণ ক্ষয়ে গিয়ে ত্বক কাগজের মতো পাতলা হয়ে যায়, ফলে ভেতরের সূক্ষ্ম নীল রক্তনালীগুলো বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যেতে শুরু করে। অন্যদিকে, হাইড্রোকুইনোন ও স্টেরয়েডের যৌথ প্রতিক্রিয়ায় মুখে হরমোনজনিত তীব্র ব্রণ বা স্টেরয়েড অ্যাকনি দেখা দেয় এবং ঘন লোম গজাতে শুরু করে। এছাড়া ফর্সাকারী ক্রিমের পারদের বিষাক্ত কণা ত্বকের লোমকূপ দিয়ে সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে মানুষের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র এবং কিডনিকে স্থায়ীভাবে বিকল বা অবশ করে দিতে পারে। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অফ ডার্মাটোলজির মতে, রোদ ও ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে ত্বককে রক্ষা করে ক্যানসার হওয়া থেকে বাঁচানোই প্রাকৃতিক মেলানিনের প্রধান কাজ, অথচ ফর্সাকারী ক্রিমগুলো জোর করে এই মেলানিন উৎপাদন ব্লক করে দেওয়ায় ত্বকের ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি প্রায় চার গুণ বেড়ে যায়।
কৃত্রিম উপায়ে ত্বক ফর্সা করার চেষ্টা না করে প্রাকৃতিক উপায়ে ত্বক উজ্জ্বল ও সুস্থ রাখার বেশ কিছু বিজ্ঞানসম্মত ঘরোয়া পদ্ধতি রয়েছে। টমেটোতে থাকা উচ্চমাত্রার লাইকোপেন এবং টক দইয়ের ল্যাকটিক অ্যাসিড প্রাকৃতিকভাবে ত্বকের মৃত কোষ দূর করে এবং কালো ছোপ ছোপ দাগ কমায়। এছাড়া কাঁচা হলুদে থাকা কারকিউমিন সরাসরি ত্বকের মেলানিন উৎপাদনকারী এনজাইমের কার্যকারিতাকে বন্ধ করে দেয়, যা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই মেছতার দাগ দূর করতে দারুণ কার্যকর। চন্দনের প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট উপাদান এবং অ্যালোভেরার প্রাকৃতিক জেলে থাকা অ্যালোসিন ক্ষতিকর কেমিক্যালের চেয়েও নিরাপদে ত্বকের আর্দ্রতা ও কোলাজেন উৎপাদন সচল রেখে সুস্থ উজ্জ্বলতা প্রদান করে। যুক্তরাজ্যের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জাস্টিন হেকস্টল বলেন যে সুস্থ ত্বকই হলো সুন্দর ত্বক, তাই অলৌকিক বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা না দিয়ে পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার মাধ্যমেই কেবল প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা ধরে রাখা সম্ভব।
মন্তব্য করুন