ফ্রিজ, আসবাবপত্রসহ সংসারের প্রয়োজনীয় নানা জিনিস কিনেছিলেন চিকিৎসক দম্পতি বিপ্লব চন্দ্র দাস ও আঁচল রায়। খিলগাঁওয়ে আঁচলের মা–বাবার বাসার পাশেই ভাড়া নিয়েছিলেন ছোট্ট একটি বাসা। ধীরে ধীরে সেই ঘর সাজিয়ে নতুন সংসার গুছিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। এরপর বরিশালে গিয়ে স্থায়ীভাবে সংসার শুরুর স্বপ্নও দেখেছিলেন দুজন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ২৭ সেপ্টেম্বর মারা যান আঁচল।
গত বছরের ১৮ এপ্রিল ঢাকায় বিয়ে হয় বিপ্লব ও আঁচলের। দুজনই চিকিৎসক হওয়ায় বিয়ের পর নিয়মিত একসঙ্গে থাকা হয়নি। চাকরির কারণে কখনো আঁচল ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায়, বিপ্লব জামালপুরে; পরে একজন ঢাকায়, অন্যজন বরগুনায়। ছুটি কিংবা ঢাকায় কাজের সুযোগ পেলেই দেখা হতো তাঁদের। সেই অল্প সময়েই ভবিষ্যৎ সংসার নিয়ে পরিকল্পনা করতেন তাঁরা। ৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে বিপ্লব সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর বরিশালে নতুন করে সংসার শুরুর পরিকল্পনাও করেছিলেন।
আঁচলের জ্বর আসে ২১ সেপ্টেম্বর। জ্বর নিয়েই সেদিন দুজনে পূজার কেনাকাটা করেন। পরীক্ষায় তখন তাঁর প্লাটিলেট ছিল এক লাখ। বিপ্লব হাসপাতালে ভর্তি হতে বললেও আঁচল রাজি হননি। পরে প্লাটিলেট দ্রুত কমে ২৫ হাজারে নেমে গেলে ২৫ সেপ্টেম্বর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে এইচডিইউ হয়ে আইসিইউতে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের পাশাপাশি স্বামী বিপ্লবও স্ত্রীকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। আইসিইউতে থাকা আঁচলকে সাহস দিয়ে বলতেন, ‘তুমি ফাইটার, তুমি ফিরবে।’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
নোয়াখালী মেডিকেল কলেজে পড়ার সময় বিপ্লব ও আঁচলের পরিচয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে তাঁরা একে অপরকে ভালোবাসার কথা জানান। পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী আঁচল ২০২৪ সালের নভেম্বরে এমআরসিপি পার্ট ওয়ান পাস করেন। মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোলজি বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মরত ছিলেন তিনি। স্ত্রীকে নিয়ে সবসময় গর্ব করতেন বিপ্লব। তাঁর ভাষায়, আঁচল ছিলেন ‘খুব ভালো ডাক্তার’।
ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে দুজনই সচেতন ছিলেন। বাসায় মশারি ব্যবহার করতেন, মশার কামড় এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতেন। তবু কোথা থেকে আঁচল ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেন, তা তাঁরা জানতে পারেননি। বিপ্লবের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি।
আঁচলের মৃত্যুর পর তাঁদের অনেক স্মৃতি এখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রয়ে গেছে- বিয়ের ছবি, সমুদ্রে ঘোরার মুহূর্ত, পেশাগত জীবনের অর্জন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা স্বপ্ন। ২৮ সেপ্টেম্বর বিপ্লব তাঁদের দুজনের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন। ছবিতে তাঁর পরা পাঞ্জাবিটি দিয়েছিলেন আঁচল, আর আঁচলের শাড়িটি দিয়েছিলেন বিপ্লবের ছোট বোন। ছবিটি আগে পোস্ট করার কথা থাকলেও ব্যস্ততার কারণে হয়ে ওঠেনি।
আঁচল মাঝেমধ্যে মজা করে বলতেন, তিনি যদি বিপ্লবের আগে মারা যান, তাহলে যেন তাঁর সমাধিতে সাদা ফুল নিয়ে যাওয়া হয়। ২৭ সেপ্টেম্বর সেই কথাই বাস্তব হয়ে যায়। বিপ্লব তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী সমাধিতে সাদা গোলাপ নিয়ে যান। যে দুজন মানুষ একসঙ্গে একটি সংসার সাজানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁদের একজন আজ শুধুই স্মৃতি; অন্যজনের সামনে পড়ে আছে সেই অসমাপ্ত সংসার, কেনা জিনিসপত্র আর একসঙ্গে দেখা ভবিষ্যতের পরিকল্পনাগুলো।
মন্তব্য করুন